ভারত-চীন-নেপাল দ্বৈরথের ইতিবৃত্তান্ত

1,208 Views

করোনার প্রকোপে গত তিন মাসের বেশি সময় ধরেই পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশ লকডাউনে আছে। এখনো লড়াই করে চলেছে এই অদৃশ্য শক্তির সাথে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও ইউরোপের দেশগুলো সহ বেশির ভাগ দেশেরই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অনেকটা ভেঙ্গে পড়েছে এবং অতি শীঘ্রই তা কাটিয়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনাও বিশেষজ্ঞরা দেখছেন না। দেশের প্রথম সারির থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি’র গবেষণা জানাচ্ছে, শুধুমাত্র গত মাসেই ভারতে ১২ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, যার বেশির ভাগই ছিলেন দিনমজুর কিংবা ছোটখাটো ব্যবসায় কর্মরত শ্রমিক। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২.৫ শতাংশের নিচে চলে যাওয়ার শঙ্কা। এদিকে CAA, NRC ইস্যুগুলোতে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা করোনা পরিস্থিতির আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল।

অন্যদিকে চীনের অর্থনীতিও এই করোনার প্রকোপে যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তা ছাড়া হংকং এর বিদ্রোহ দমনের জন্য চীনের পার্লামেন্টে জাতীয় নিরাপত্তা আইন পাস, তাইওয়ান ইস্যু, করোনা পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোর তাদের বিরুদ্ধে নেয়া সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিষয়ে দুশ্চিন্তা সহ চীনও খুব একটা স্বস্তিতে নেই।

এমন যখন সার্বিক অবস্থা, ঠিক সে সময়ে ঘটনার সূত্রপাত ৮ই মে, ২০২০। ভারতের উত্তরখন্ডে চীনের তিব্বত সীমান্তের নিকট প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং একটি ৮০ কিমি দীর্ঘ সড়ক উদ্বোধন করেন। এই ঘটনা চীনের সাথে দ্বন্দ্বের পাশাপাশি একই সাথে উস্কে দেয় নেপালের সাথে ভারতের অমীমাংসিত লিপুলেখ, কালাপানি ও লিম্পিয়াধুরা অঞ্চলের ইস্যুকেও। কারণ সড়কটির একাংশ যাচ্ছে এই লিপুলেখ অঞ্চল দিয়ে। 

ভারতের সাথে চীন এবং পাকিস্তানের সাথে সীমান্ত বিরোধ আজকালের কথা না। কিন্তু অনেকদিন ধরেই পাকিস্তানের সাথে খোলাখুলি ভাবে সংঘাতে জড়িয়ে আছে ভারত, জম্মু – কাশ্মীর অঞ্চল নিয়ে। ২২শে জুন এক ভারতীয় সৈন্য সহ গত একমাসে ৪জন ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়েছে পাকিস্তানি সৈন্যের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে। এর মধ্যে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, জাতীয় নাগরিকপঞ্জী, আসন্ন নির্বাচন ইত্যাদি নিয়ে নিজেদের দেশের মধ্যকার পরিস্থিতিও বলতে গেলে অনুকূলে নেই তাদের। এরই মধ্যে চীন-নেপালের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ল ভারত।

ভারত- নেপাল : প্রথমে একটু পিছিয়ে যাই। অ্যাংলো-নেপালিজ (১ নভেম্বর ১৮১৪ – ৪ মার্চ ১৮১৬) যুদ্ধ সংঘটিত হয় গোর্খা (বর্তমান নেপাল) রাজা পৃথ্বী নারায়ন সাহা ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে। এই যুদ্ধের শেষ হয় ১৮১৬ সালের ৪ মার্চ ব্রিটিশদের সাথে নেপালের স্বাক্ষরিত সুগাউলি চুক্তির মাধ্যমে।  সেই চুক্তি অনুসারে মহাকালি নদীই হবে দুই দেশের মধ্যকার সীমানা। তাহলে চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও কেন এখনো বিবাদ বিদ্যমান?

  • Save

 চিত্রঃ নেপাল-ভারতের মধ্যকার বিতর্কিত অঞ্চল
উৎসঃ thefederal
.com

মহাকালি নদী লিম্পিয়াধুরা থেকে দুই ভাগে ভাগ যায়। আর ভারত লিপুলেখ থেকে নদীর উৎস ধরে নিয়ে কালাপানি, লিপুলেখ নিজেদের বলে দাবি করে আসছে। আবার ওইদিকে নেপাল লিম্পিয়াধুরাকে মহাকালি নদীর উৎস হিসেবে দাবি করে কালাপানি পর্যন্ত নিজেদের বলে দাবি করে আসছে। বলা হয়ে থাকে সুগাউলি চুক্তি নেপালের উপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল, তবুও যদি তাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে নিতে হয়ও তবুও সেখানে সমস্যা এই যে, নেপালের কাছে সেই চুক্তির আসল কপিটি নেই!  নেপালের জরিপ বিভাগের সাবেক পরিচালক বুদ্ধি নারায়ণ শ্রেষ্ঠার তৈরি করা রিপোর্টে ১৮৫০ এবং ১৮৫৬ সালের মানচিত্রকে যদিও এখন দলিল হিসেবে দেখানো হচ্ছে নেপালের পক্ষ থেকে, তবে ভারত তা মেনে নিতে নারাজ।

আবার ভারতের দিক থেকেও সমস্যা কম নয়। ১৯৬২ সালে চীনের সাথে যুদ্ধের সময়কালে ভারত নেপালের ভূখন্ডের অনেকটা ভিতরে ঢুকে পড়ে চীনা সৈন্যদের দিকে নজর রাখতে। যার পরে আর সেখান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নি। আর এমনিতেও বিভিন্ন সময়ে নেপাল তাদের ভারত সীমান্তে সৈন্য মোতায়েনের ব্যাপারে উদাসীন ছিল। যার সুযোগ ভারত সময়ে সময়ে ভালোই কাজে লাগিয়েছে। ক্রমান্বয়ে নেপালের সীমান্তবর্তী ২৩ টি জেলার কমপক্ষে ৬০০০০ হেক্টর জমি দখলের অভিযোগ আছে ভারতের বিরুদ্ধে।  

  • Save

চিত্রঃ নেপালকে নিজ স্বার্থে ব্যবহারে ভারত চীনের প্রচেষ্টা
উৎসঃ Cartoonmovement
.com

২০১৫ সাল থেকে নেপাল সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বারবার বৈঠকে বসার আহবান করে আসতে থাকলেও ভারত তাতে সাড়া তো দেয়ই নি, বরং এখন লিপুলেখ দিয়ে রাস্তা তৈরী করে এই বিরোধ নতুন করে উস্কে দিয়েছে। তবে রাস্তার কাজ যে হুট করে শুরু হয়েছে তা নয়, অনেক দিন ধরেই হচ্ছে এ কাজ। কিন্তু এমন মুহূর্তে এসে বন্ধুপ্রতিম দেশ নেপাল প্রতিবাদ করায় ভারত বিস্ময় প্রকাশ করছে এবং আশংকা প্রকাশ করছে যে চীনের মদদে নেপাল এমন দুঃসাহসিকতা দেখাচ্ছে। যদিও নেপালের প্রতিবাদ জানানোর নিজস্ব যথেষ্ট কারণ আছে, কিন্ত বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন এতদিন যুতসই ব্যাকআপ ছিল না বলে এই বিষয়টা নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করে নি নেপাল। এখন চীন-ভারত দ্বন্দ্বের সূত্র ধরে চীন নেপালের পিছে এসে দাঁড়িয়েছে বলে নেপাল গলা তুলে কথা বলছে, এমনকি সীমান্তে সৈন্য পর্যন্ত জড় করেছে !

এখানে আগ্নেয়াস্ত্রের কোনো ব্যবহার না হওয়াতে অনেকে অবাক হতে পারেন। কিন্তু আসল ব্যাপার হচ্ছে, চীন আর ভারত একের পর এক সমঝোতা চুক্তি করেছে। ১৯৯৩ সালে নরসিমহা রাও যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সেই সময়ে মেইন্টেন্যান্স অফ পিস এন্ড ট্র্যাঙ্কুয়েলিটি চুক্তিটি সাক্ষরিত হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে আস্থা বর্ধক ব্যবস্থাপত্রে সই করে দুই দেশ। ২০০৩ আর ২০০৫ সালেও চুক্তি হয়েছে। আর ২০১৩ সালে সই হওয়া বর্ডার ডিফেন্স কোঅপারেশন এগ্রিমেন্টই এই বিষয়ে সর্বশেষ চুক্তি।

চুক্তির ব্যাপারে মেজর জেনারেল মেহতা বলেন, “সীমান্তের যে অংশগুলো অমীমাংসিত, সেখানে দুই দেশই শান্তি বজায় রাখে আর নির্দিষ্ট চুক্তি থাকার ফলে কোথাও গুলি চলে না। দুই দেশই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আগেই, যে সীমান্ত সমস্যাগুলো নিয়ে তখনই ভাবা যেতে পারে যখন আমাদের মধ্যে অর্থনৈতিক আর নাগরিক সম্পর্কগুলো পাকাপোক্ত হয়ে উঠবে।”

“দুটো দেশের মধ্যে এরকম সিদ্ধান্ত রয়েছে যে, ফ্রন্ট লাইনে যেসব সেনা সদস্য মোতায়েন থাকবেন, তাঁদের কাছে কোনও রকম অস্ত্র থাকবে না। যদি সেনা র‍্যাঙ্ক অনুযায়ী কোনও অফিসারের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র রাখা নিয়ম হয়, তাহলে তার নল মাটির দিকে ঘুরিয়ে রাখা থাকবে। সেজন্যই দুই দেশের সেনাসদস্যদের হাতাহাতি বা কুস্তি করার ভিডিও দেখা যায়, কোথাও গুলি বিনিময়ের ছবি দেখা যায় না। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের এরকম কোনও চুক্তি নেই,” বলছিলেন  চীনে কর্মরত সিনিয়র সাংবাদিক শৈবাল দাসগুপ্ত।

এজন্য ভারত-চীন সীমান্তে বড়জোর দুই বাহিনীর মধ্যে হাতাহাতি হয় – তার বেশী কিছু না সাধারণত।

ভারত চীন সম্পর্কটা বুঝে উঠতে আমাদেরকে একটু ইতিহাস ঘাটতে হবে। চীনের সাথে কিন্তু ভারতের সম্পর্কটা এমন তিক্ত ছিল না আগে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার জন্য চীনকে ভারত ব্যাপক সমর্থন করেছিল। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কও ভালো ছিল। জওহরলাল নেহেরুর সময় তো একটা কথা খুব প্রচলিত ছিল, “হিন্দি চীনি ভাই ভাই”।

  • Save

চিত্রঃ শত্র‌ুতা দমে আছে সমঝোতায়
উৎসঃ Baliyans
.com

এদিকে ১৯৫০ সালের অক্টোবরে চামদোর সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে চীন জোর পূর্বক তিব্বতকে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। এরপর ১৯৫৯ সালের মার্চে, তিব্বতের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা চতুর্দশ দালাই লামা চৈনিক শাসন্তন্ত্রের বিরুদ্ধে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর ভারতের উত্তরখন্ডে পলায়ন করেন এবং সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করেন, যা চীনের শাসনকর্তাদের ভয়ানকভাবে ফুঁসিয়ে তোলে। এরই জের ধরে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে একপেশে ভাবে চীন জয়লাভ করে এবং বিতর্কিত আকসাই চীন অঞ্চলটি নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নেয়। সেই থেকে চীন ও ভারতের মধ্যে অহি নকুল সম্পর্ক বিদ্যমান এবং সেই আকসাই চীন সীমান্ত, যা এখনো অমীমাংসিত। আর সেখানেই বর্তমান ভারত-চীন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

Leave a comment

Share via
Copy link