ওমানের কার্বন শোষণকারী পাহাড়

1,772 Views

আরব উপদ্বীপের দেশ ওমানের ইবরা। এক রুক্ষ, শুষ্ক মরু প্রান্তর। চারদিকে শুধু পাথর আর মরুভূমির লাল বালি। যতদূর চোখ যায় শুধুই  মরুভূমি। কোথাও কোথাও  ভেড়ার পাল বা উটের দল খাবারের খোঁজে চষে বেড়াচ্ছে এই রুক্ষ প্রান্তরে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে এই মরুভূমি, রুক্ষ পাহাড় প্রকৃতিতে কোন ভূমিকা রাখে না। অথচ এই অপ্রতিরোধ্য প্রকৃতি মানুষের জন্য এমন একটি কাজ করে চলেছে নিরবে নিভৃতে যা খুঁজছে মানুষ শতাব্দী ধরে। হাজার হাজার বছর ধরে এই মরুর পাথর গুলো শোষণ করে চলেছে বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন! বাতাস থেকে কার্বনডাইঅক্সাইড শোষণ করে তাকে পরণিত করছে লাইম স্টোন বা চুনাপাথরে।  

এখানের কালো পাথরের উপর দেখা যায় কার্বনডাইঅক্সাইড থেকে সাদা কার্বনেটে পরিণত হওয়া খনিজের দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক কারুকাজ। যা সাধারণ পাথরকে পরিণত করে প্রাকৃতিক মোজাইকে। এমনকি বসন্ত কালে পাথরের উপর জমে থাকা পানিও কার্বন শোষণ করে বরফের মত শক্ত হয়ে যায়। পানিতে কার্বনেট দ্রবীভূত হয়ে তা কার্বনডাইঅক্সাইড এর বরফে রুপ নেয়। এরপর পানি শুকিয়ে গেলে তা শুকিয়ে পাথরে পরিণত হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন এটি কার্বন শোষণের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। যা কার্বনের খনিজকরণ বা মিনারেলাইজেশন নামে পরিচিত। এটি খুব অল্প খরচে বৃহৎ পরিসরে ব্যবহার করা যেতে পারে। কিছু বাধা বিপত্তি কাটাতে পারলে এই প্রক্রিয়া জালবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। 

কার্বনডাইঅক্সাইড কে পাথরে পরিণত করে ওমানের এই পাথুরে পাহাড় বায়ুমণ্ডল থেকে হাজার হাজার টন কার্বন অপসারণ করছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন পৃথিবীর অন্য অনেক জায়গায়ও এরকম পাথর থাকতে পারে। 

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ ড. পিটার ক্যালেমন ওমানের এই পাথরগুলো নিয়ে ১৯৯০ এর দশক থেকে গবেষণা করছেন। তার মতে বিশ্বব্যাপী কার্বন সংরক্ষণের যত গুলো প্রজেক্ট নিয়ে গবেষণা হচ্ছে তার মধ্যে এটি অন্যতম সম্ভাবনাময়ী। অনেক বিজ্ঞানী বাতাস থেকে মেশিনের মাধ্যমে সরাসরি কার্বন অপসারণ নিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু তাতে অসলে খুব বেশি পরিমাণ কার্বন অপসারণ করা যায় না। 

ওমানের এই পাহাড় গুলো ১০০ মিলিয়ন বছর আগে সমুদ্র সমতলে ছিল। পৃথিবীর ট্যাকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের কারণে এগুলো উপরের দিকে উঠে আসে। এই পাথরগুলোর কার্বন শোষণের ক্ষমতা এতই বেশি যে এইগুলোকে সম্পূর্ণরুপে কাজে লাগানো গেলে শত শত বছরের কার্বন জমা রাখা যাবে। শুধুমাত্র ওমানই অন্ততপক্ষে বছরে ১ বিলিয়ন টন কার্বন শোষণ করতে পারবে। এই পাথর গুলোর গঠন বিশেষায়িত হলেও এগুলো স্বকীয়  নয়। আমেরিকার উত্তর ক্যালিফোর্নিয়া, পাপুয়া নিউগিনি, আলবেনিয়া সহ পৃথিবীর আরও কিছু জায়গায় একই গঠনের পাথর পাওয়া গেছে।

ড. ক্যালেমন প্রায় তিন দশক ধরে ওমানের পাথরগুলো নিয়ে গবেষণা করছেন। প্রথম দিকে তিনি ভেবেছিলেন এই কার্বনেট গুলো হয়তো মিলিয়ন বছরের পুরানো। কিন্তু ২০০৭ সালের দিকে তিনি অনেকগুলো কার্বনেটের সন্ধান পান যা পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন সেগুলো ৫০,০০০ বছরের পুরানো হবে। তিনি যা ভেবেছিলেন আসলে তার থেকে দ্রুত এই মিনারেলাইজেশন হয়েছে। এরপর থেকে তিনি কার্বনেট গঠনের প্রক্রিয়াতে অধিক মনোনিবেশ করেন। বর্তমানে বহুজাতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রজেক্ট পরিচালনা করছেন ড. ক্যালেমন। এই প্রজেক্টের অধীনে পাথরগুলোর বিভিন্ন স্তরের  গঠন বুঝার জন্য প্রায় ১৩০০ ফুট গভীর গর্ত করা হয়েছে। ড. ক্যালেমনের দলে রয়েছেন ৪০ জন বিজ্ঞানী। এ প্রকল্পে নাসা সহ আরও অনেক বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান অর্থায়ন করেছে। 

শিল্প বিপ্লবের পর বায়ুতে কার্বনডাইঅক্সাইড বেড়ে ২৮০ পিপিএম থেকে ৪০৫ পিপিএম হয়েছে। বর্তমান হিসাব বলছে এভাবে চলতে থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রায় ৬ ডিগ্রী পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। যা হবে মানবজাতি সহ পুরো পৃথিবীর  জীবদের জন্য এক ভয়াবহ দু:স্বপ্ন। ২০১৫ সালে প্যারিস জালবায়ু চুক্তিতে স্বাক্ষর করে পৃথিবীর ১৯৬ দেশ। এই চুক্তির অধীনে বিশ্ব নেতারা কার্বনডাইঅক্সাইড এর নি:সরণ কমানোর মাধ্যমে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন। এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে কার্বন নির্গমন কমানোর পাশাপাশি বায়ু থেকে  কার্বন অপসারণও গুরুত্বপূর্ণ। একই তাড়না থেকে দিন রাত কাজ করে চলেছেন বিজ্ঞানী ক্যালেমনের দল। 

গভীর গর্ত খননের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন স্তর থেকে তারা প্রায়  ১৩ টন নমুনা সংগ্রহ করেন। এই সব নমুনার উপর গবেষণা চালিয়ে বুঝার চেষ্টা চলছে কিভাবে ৯০ মিলিয়ন বছর ধরে এই শিলা গুলো কার্বন জমা করে রেখেছে। প্রক্রিয়া জানা গেলে চেষ্টা কর্ হবে কার্বন জমাটবদ্ধ করার সময় কিভাবে কমানো যায় তা নিয়ে। 

একই ধরনের আরেকটি প্রকল্পে কাজ করছেন ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. ড্রিপল। তিনি মূলত খনি বিশেষজ্ঞ। ড. ড্রিপল লক্ষ্য করেছেন নিকেল, তামা,  ডায়মন্ড সহ বিভিন্ন ধাতুর পরিত্যক্ত খনিগুলোর পাথর বা শিলা সমূহে মানুষ হস্তক্ষেপ না করলে তা ধীরে ধীরে বাতাস থেকে কার্বন শোষণ করে। ড. ড্রিপল এখন অসংখ্য খনি কোম্পানির সাথে কাজ করছেন। তার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে খনির পাথরগুলোকে কার্বন শোষণ উপযোগী করে তোলা যাতে করে অন্তত খনির উত্তোলন কাজ থেকে কার্বন বেরিয়ে আসে তা দ্রুত  জমাটবদ্ধ করে ফেলা যায়। যদিও ড. ড্রিপলের মতে বৈশ্বিক সমস্যার সাথে এটা খুবই ক্ষুদ্র সমাধান তবুও তারা ভাবছেন এটা হতে পারে কার্বন সমস্যার সমাধানের একটা সুন্দর শুরু।  

বিজ্ঞানীরা কি কার্বন সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান বের করতে পারবেন? না কি নিজেদের ডেকে আনা সমস্যা সভ্যতাকেই ধ্বংস করে দিবে?  সময়ই এর উত্তর বলে দিবে। কিন্তু আগত সমস্যার  জন্য বসে না থেকে আগাম প্রস্তুতি নেয়াই হবে বর্তমান সভ্য সমাজের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ।

Let’s scrutinize past and present to see what’s waiting in the future.

Leave a comment

Share via
Copy link