সাইক্লোন, হারিকেন, টাইফুন পার্থক্য কোথায় ?

1,507 Views

সৃষ্টির আদি থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ পৃথিবীর জন্য নিয়মিত ঘটনা। কখনো কখনো  সর্বগ্রাসী রূপে আবির্ভূত হয়ে প্রকৃতি মানুষকে মনে করিয়ে দেয় এই মর্ত্যলোকে কেউই প্রকৃতি থেকে শক্তিশালী নয়। প্রাকৃতিক এসব ঘটনা তার সৃষ্টির নিয়মে চলবে। কিন্তু আঠারো শতকে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে মানুষের প্রকৃতিকে জয় করতে চাওয়ার প্রবণতা যেন প্রকৃতিকে রুষ্ট করে তুলছে। বিভিন্ন প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগ বেড়ে গেছে বহুগুণে। বছর বছর ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বাড়ছে। ঘূর্ণিঝড়ের শক্তিমাত্রাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির প্রক্রিয়া একই হলেও স্থানভেদে নাম ভিন্ন হয়ে যায়।  

ঘূর্ণিঝড় যে ভাবে সৃষ্টি হয়

বিষুবীয় অঞ্চলে সূর্যের উত্তাপে  সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠ সংলগ্ন গরম বাতাস হালকা ও আর্দ্র হয়ে উপরে উঠে যায়। ফলে ঐ স্থানে বায়ুর চাপ কমে যায়। বায়ুর চাপের সাম্য বজায় রাখতে মেরু অঞ্চলের দিক থেকে শীতল বাতাস ঐ স্থানের দিকে আসতে থাকে। উষ্ণ সমুদ্রপৃষ্ঠের সংস্পর্শে এসে শীতল বাতাসও আর্দ্র এবং উষ্ণ হয়ে উপরে উঠে। এ বাতাস উপের উঠে ঘনীভবনের ফলে উষ্ণতা হারায়। ফলে বাতাসে অবস্থানরত জলীয়বাষ্প মেঘে পরিণত হয়। এভাবে ক্রমাগত শতীল ও উষ্ণ বায়ুুর প্রবাহ এক ঘূর্ণি পাকে রুপ নেয়। এই ঘূর্ণিপাকের শক্তি যোগান দেয় উষ্ণ সমুদ্র। সমুদ্রপৃষ্ঠ দীর্ঘ সময় উষ্ণ না থাকলে নিচ থেকে উপরের দিকে উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের প্রবাহ  যা ঘূর্ণিবায়ু এবং মেঘের সৃষ্টি করে, তা কমে যাবে বা বন্ধ হয়ে যাবে। মূলত এ কারণেই ঘূর্ণিঝড় যখন স্থলেভাগে চলে যায় তখন দূর্বল হয়ে পড়ে। কারণ ভূ-পৃষ্ঠ উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের জন্য প্রয়োজনীয় তাপ সরবরাহ করতে পারে না। তা হলে সমুদ্র কিভাবে করে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পানির আপেক্ষিক তাপের মধ্যে। আমরা জানি পানির আপেক্ষিক তাপ বেশি। তাই পানি উষ্ণ হতে ও তাপ হারাতে দীর্ঘ সময় এবং অধিক তাপ প্রয়োজন হয়। ফলে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা একবার স্বাভাবিক থেকে বেশি হয়ে গেলে(নূন্যতম ৫০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত ২৬-২৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস)  তা আবার তাপ হারিয়ে পূর্বের অবস্থায় আসতে ঘূর্ণিঝড়ের জন্ম দেয়। ভূ-পৃষ্টের আপেক্ষিক তাপ কম। তাই ভূ-পৃষষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়লেও তা দ্রুত কমে যায়। ফলে ঘূর্ণিঝড়ের জন্য ক্রমাগত উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ুর সরবরাহ ভূ-পৃষ্ঠ দিতে পারে না। 
আদতে আরও কিছু প্রভাবক ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য দায়ী। যেমন: বিষুবীয় রেখা থেকে কোন অঞ্চলের দূরত্ব, সাধারণত ১০ থেকে ৩০ ডিগ্রী নিরক্ষরেখার মধ্যে অবস্থানরত সমুদ্রে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। বাতাসের আর্দ্রতাও বড় ভুমিকা পালন করে। বৈশ্বিক বায়ু প্রবাহ তন্ত্র যা Coriolis effect ( পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফলে সৃষ্ট বল)  দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, এরুপ ভৌগলিক অবস্থানে  ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য দায়ী।  

ঘূর্ণিঝড়কে সাধারণভাবে ট্রফিক্যাল সাইক্লোন বলা হয়। কিন্তু উৎপত্তির স্থানভেদে এটি সাইক্লোন, হারিকেন, টাইফুন নামে পরিচিত। 

সাইক্লোন

ভারত মহাসাগর অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের কোথাও এমন ঘূর্ণি বায়ুর সৃষ্টি হলে তাকে বলা হয় সাইক্লোন। বাংলায় আমরা ঘূর্ণিঝড় বলি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব দিক পর্যন্ত ভারত মহাসাগর বিস্তৃত। ১৯৭০ সালে বাংলাদেশে এক প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিল। যা এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে সব থেকে বেশি প্রাণ কেড়ে নেওয়া ঘূর্ণিঝড়। ভোলা ও আশে পাশের জেলা মিলে প্রায় ৩ থেকে ৫ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। ১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সহ পরবর্তী কালের সিডর, আইলা, মহাসেন এরুপ অনেক ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল। আর প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ে দক্ষিণ অঞ্চলের উপকূলবাসীদের রক্ষায় সবার আগে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যায় সুন্দরবন। যুগ যুগ ধরে প্রকৃতি নিজেই যেন নিজের সৃষ্ট দুর্যোগ থেকে মানুষদের রক্ষা করে আসছে। 

টাইফুন:

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্ট ঘূর্ণিবায়ু টাইফুন নামে পরিচিত। চীন,জাপান সহ পূর্ব এশিয়ার দেশ সমূহে প্রতিবছর টাইফুন আঘাত হানে। ২০১৯ সালে জাপানে আঘাত হানে টাইফুন হাগিবিস। যা গত অর্ধ শতাব্দীতে জাপানে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী টাইফুন ছিল। হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তীব্র বন্যা, ভূমিধ্বস সহ টাইফুনে সৃষ্ট দুর্যোগের কারণে।

হারিকেন:

 ঘূর্ণিবায়ু যখন আটলান্টিক মহাসাগরে বা পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে  সৃষ্টি হয় তখন তাকে হারিকেন বলা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকার পশ্চিম দিক হয়ে সমগ্র ইউরোপ আটলান্টিক মহাসাগর এলাকার অন্তর্গত। ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে  বড় হারিকেন হচ্ছে ২০০৫ সালে আঘাত হানা ক্যাটরিনা।

বায়ুমণ্ডল এবং সমু্দ্রের তাপীয় ভারসাম্য রক্ষার্থে ঘূর্ণিঝড় বায়ুমণ্ডলের নিত্য ঘটনা গুলোর একটি। মানুষের হস্তক্ষেপের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পৃথিবীর  উষ্ণতা ক্রমশ বৃদ্ধির জন্য মানুষ কখনো দায় এড়াতে পারে না। আর পৃথিবীর উষ্ণতা যত বাড়বে ঘূর্ণিঝড় সহ অন্যান্য দুর্যোগ হবে তত শক্তিশালী। কারণ প্রকৃতি যে কোন ভাবেই তার সাম্য অবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা করবে। দিন শেষে ক্ষতির মুখে পড়বে মানুষই। লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘর-বাড়ি হারিয়ে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে  পরিণত হবে। সৃষ্টি হবে এক করুণ পরিস্থিতির। ২০০৮ সাল থেকে গড়ে প্রতি বছর প্রায় ২৪ মিলিয়ন মানুষ জালবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে। বিশ্ব বাংকের তথ্যমতে ২০৫০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ১৪৩ মিলিয়নে পৌঁছাবে। প্রকৃতির সাথে পাল্লা দিয়ে মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে গিয়েই যেন মানুষ অধিক মানবেতর পরিস্থিতি সৃষ্টির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির সাথে পাল্লা না দিয়ে প্রকৃতির হাত ধরে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই রয়েছে মুক্তি। 

Let’s scrutinize past and present to see what’s waiting in the future.

Leave a comment

Share via
Copy link