আগাফিয়া – সাইবেরিয়ান বরফ রাজ্যের প্রতিকূলতা জয় করা এক নি:সঙ্গ মানবী।

1,444 Views

সাইবেরিয়া নামটি আমাদের অনেকের কাছে বেশ পরিচিত। পৃথিবীর শীতলতম মানব বসতি এবং পরিযায়ী পাখির জন্যই আমরা প্রায়ই সাইবেরিয়ার নাম শুনি। প্রতি বছর সাইবেরিয়া থেকে শীতকালে হাজার হাজার পরিযায়ী বা অতিথি পাখি হাজার হাজর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ গুলোতে আসে। কিন্তু আমরা কি কখনো চিন্তা করেছি এই পাখি গুলো আসলে কেন এত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এখানে আসে? তাও আবার শীতকালে। উত্তরটি হয়তো আমাদের  অনেকের জানা। আসলে সাইবেরিয়ার শীতকাল আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শীতকাল একই নয়। শীতকালে সেখানে তাপমাত্রা মাইনাস ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াস এরও নিচে নেমে যেতে পারে। শীতকালে এত বেশি ঠাণ্ডা সাইবেরিয়াতে অনুভূত  হয় যা সহ্য করতে পারে না পাখিরা। একই সাথে প্রচণ্ড  খাদ্যাভাব দেখা দেয়। এই দুই কারণে পাখিরা হাজার মাইল দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। একবার কল্পনা করুন  এই কঠিন প্রতিকূল পরিবেশে একা বসবাস করছেন আপনি! আপনি হয়তো ভাবছেন আমি তো এক শীতেই মরে বরফ হয়ে যাবো। কিন্তু এই ভয়ঙ্কর প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে সেখানে একাকী বসবাস করে চলেছেন ৭০ বছর উর্ধ্ব এক নারী। বলছিলাম আগাফিয়া লাইকবের কথা। 

আগাফিয়ার পুরো নাম আগাফিয়া কারপোভান লাইকভ। ১৭ এপ্রিল ১৯৪৪ সালে রাশিয়ার এক অর্থডক্স খ্রিষ্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। আগাফিয়ার জন্মস্থানটি সাধারণভাবে সাইবেরিয়ান টাইগা নামে পরিচিত। টাইগা বলতে সামগ্রিকভাবে উত্তর মেরুর কনিফেরাস বনগুলোর বাস্তুসংস্থানকে বুঝায়। টাইগা আলাস্কা থেকে কানাডা, ইউরোপ হয়ে রাশিয়ার পূর্বভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বনগুলো নিরক্ষরেখা থেকে ৫০ ডিগ্রী থেকে ৭০ ডিগ্রী উত্তরে উঁচু পাহাড়ি এলাকাজুড়ে থাকে। যেখানে টাইগায় মানব বসতি খুবই সীমিত সেখানে জনবসতিপূর্ণ স্থান ছেড়ে দূর্গম পাহাড়ে একাকী বসবাস করা তো অকল্পনীয়। 

বাবা কার্প লাইকভ, মা আকুলিনা লাইকভের ৪ সন্তান। তাদের মধ্যে আগাফিয়া সবার ছোট। ১৯৩৬ সালে লাইকভ পরিবার জীবন নাশের হুমকিতে পড়ে ধর্মের কারণে। কার্প লাইকভের এক ভাইকে হত্যা করে রাশিয়ার বলশেভিক বাহিনী। পরবর্তীতে জীবন ও ধর্ম রক্ষার্থে কার্প ও আকুলিনা লাইকভ তাদের বড় দুই সন্তান সাভিন ও নাটালিয়াকে নিয়ে এলাকা ছেড়ে দূর্গম অঞ্চলে পালিয়ে যান। তারা টাইগাতে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তাদের ছোট দুই সন্তান দিমিত্রি ও আগাফিয়ার জন্ম হয়। দিমিত্রি ও আগাফিয়া জন্ম থেকেই প্রচণ্ড প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে উঠেন। তারা ইরিনাথ নদীর পাশের একটি জায়গায় বাস করতেন। লোকালয় থেকে অনেক দূরে থাকার কারণে আগাফিয়ার পরিবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা জানতোই না। তাদের জীবনে কোন প্রভাব ফেলেনি এই ভয়ালযুদ্ধ।  মা আকুলিনা ১৯৬১ সালে অনাহারে  মারা যান। তিনি সন্তানদের বাঁচিয়ে রেখে নিজে না খেয়ে মারা যান। তার চার সন্তানের তিন জন ১৯৮১ সালে মারা যায়। ১৯৮৮ সালে বাবা কার্প মৃত্যুবরণ করেন। বাকি থাকে শুধু আগাফিয়া। আগাফিয়া নিজের জন্য একটি ছাগল ও মুরগি সংগ্রহ করেন। থাকার জন্য একটি কুঁড়ে ঘরও নির্মাণ করেন। আগাফিয়াকে প্রায়ই মেরু ভাল্লুকের মুখোমুখি হতে হয়। আগুন জ্বালিয়ে এবং গাছের ডাল দিয়ে শব্দ করলে ভাল্লুক চলে যায়। অনেক সময় তাতেও কাজ না হলে আগাফিয়া শুধুই সৃষ্টিকর্তাকে ডাকেন। আগাফিয়া বিনা কারণে কোন প্রাণী হত্যা করেন না। বনের প্রতিটি গাছপালা জীবজন্তু যেন তাকে আপন করে নিয়েছে। বিশেষ করে শীতকালে যখন মাটিতে কয়েক ফুট বরফের স্তর থাকে তখন জীবনযাপন খুব কঠিন হয়ে পড়ে। দেখা দেয় তীব্র খাদ্য সংকট। পান করার মত বিশুদ্ধ পানিরও সংকট দেখা দেয়। প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেন আগাফিয়া। আগাফিয়া প্রচণ্ড ধার্মিক মহিলা। ধর্মগ্রন্থ  পাঠ করেই তার সকাল শুরু হয়। আগাফিয়ার ধর্মগ্রন্থটি প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো। পরিবার থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। 

১৯৮০ সালে রাশিয়ান সাংবাদিক ভ্যাসিলি প্যাসকভ আগাফিয়ার পরিবারের নির্জন জীবনযাপন  নিয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। ১৯৮৮ সালে তার বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে আগাফিয়া সম্পূর্ণ একা হয়ে যান। আগাফিয়া আবাকান অঞ্চলের সায়ান পর্বতমালার ১০৫০ মিটার উঁচু পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করেন। যা নিকটবর্তী শহর থেকে প্রায় ২৪০ কিলোমিটার দূরে। জীবনের প্রথম ৩৫ বছর আগাফিয়া পরিবারের সদস্য ছাড়া বাহিরের কোন মানুষ দেখেননি। ১৯৭৮ সালে ৪ জন ভূতত্ত্ববিদের একটি দল গবেষণা কাজে টাইগার আকাশে হেলিকপ্টারে করে চক্কর দিচ্ছিলেন। এমন সময় তারা আগাফিয়াকে দেখতে পেয়ে হেলিকপ্টার অবতরণ করান। তারা প্রথম দেখায় আগাফিয়াকে মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ মনে করেন। কারণ তারা আগাফিয়ার কথা বুঝতে পারছিলেন না। আদতে পুরো জীবন জনবসতি থেকে দূরে থাকার কারণে তার মুখের ভাষার সাথে সমসাময়িক রাশিয়ান ভাষার পার্থক্য সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ, পশু শিকার, রান্না করা, সেলাই কাজ, ধর্ম গ্রন্থ পাঠ সহ দৈনন্দিন কাজে আগাফিয়ার দক্ষতা দেখে তাদের ভুল ভাঙে। আগাফিয়ার সাথে প্রায় ১০ বছর ইউরেফি নামে এক ভূতত্ত্ববিদ বাস করেন। তিনি আগাফিয়ার বাবার মৃত্যুর কয়েক বছর পর তাকে সঙ্গ দিতে এসেছিলেন। যদিও তিনি খাদ্য ও জ্বালানি কাঠের জন্য পুরোপুরি আগাফিয়ার উপর নির্ভর করতেন। ২০১৫ সালে ইউরেফি বার্ধক্যজনিত রোগে মারা যান। 

প্রায় ৭৫ বছরের জীবনে আগাফিয়া মোটামুটি ৬ বারের মত টাইগা অঞ্চলের বাহিরে গিয়েছেন। ১৯৮০ সালে ছিল প্রথমবার। সাংবাদিক প্যাসকবের প্রবন্ধের পর আগাফিয়ার ঘটনা পুরো রাশিয়ায় সাড়া ফেলে। তৎকালীন সোভিয়েত সরকার আগাফিয়াকে এক মাস সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন রাজ্যে ভ্রমণের সুযোগ করে দেয়। সেই বার জীবনে প্রথমবারের মত আগাফিয়া বিমান, গাড়ি, বড় বড় দালান দেখতে পান। সেবারের পর আরও কয়েকবার পায়ের ব্যাথার চিকিৎসা নিতে নিকটবর্তী হসপিটালে গিয়েছিলেন আগাফিয়া। আশে পাশের অঞ্চলের পুরাতন অর্থডক্স খ্রিস্টানদের সাথেও দুই একবার দেখা করতে গিয়েছিলেন। এ ছাড়া তিনি আর কখনো তার বাসস্থানের জায়গা ছেড়ে যাননি। 

আগাফিয়া বড় শহরের জীবন থেকে টাইগার জীবন বেশি পছন্দ করেন। তার দাবি, শহরের বাতাস, পানি তাকে অসুস্থ করে ফেলে। কোলাহলপূর্ণ শহুরে ব্যস্ত রাস্তাও তার কাছে যথেষ্ট বিরক্তিকর লেগেছে। ২০১৯ সালের মাঝামাঝি  পর্যন্ত আগাফিয়া তখনো টাইগাতেই একাকী জীবনযাপন করে যাচ্ছেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আগাফিয়া প্রকৃতিকে ভালোবেসে বেঁচে থাকতে চান। প্রচণ্ড প্রতিকূল প্রকৃতির প্রতি  আগাফিয়ার এই ভালোবাসা আমাদের মনে করিয়ে দেয় দিন শেষে মানুষ প্রকৃতিরই সন্তান। প্রকৃতির কাছে কোন জীবের ভেদাভেদ নেই। সকল জীবের বেঁচে থাকার সমান অধিকার রয়েছে। কিন্তু মানুষ প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ জীব হয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে গিয়ে যেভাবে প্রকৃতির ক্ষতি করে চলেছে এক সময় হয়তো প্রকৃতি রুষ্ট হয়ে শ্রেষ্ঠ জীবকে ছুঁড়ে ফেলে তার বদলা নিবে। মানুষ তখন হয়তো বুঝবে প্রকৃতিকে জয় করার সামর্থ্য কোন জীবের নেই। যা আছে তা হলো প্রকৃতিকে ভালোবেসে প্রকৃতির সব সন্তানের সাথে মিলেমিশে বেঁচে থাকার সামর্থ্য। 

Let’s scrutinize past and present to see what’s waiting in the future.

Leave a comment

Share via
Copy link