প্লাজমা থেরাপি- করোনা চিকিৎসায় দেখাচ্ছে আশার আলো

1,277 Views


সাম্প্রতিক সময়ের বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় ভ্যাক্সিন আবিষ্কারে যখন নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছেনা, তখনই প্লাজমা থেরাপি কিছুটা হলেও আশার আলো দেখাচ্ছে। আসুন জেনে নেওয়া যাক কি এই প্লাজমা থেরাপি।
প্লাজমা থেরাপি কী:
একটি ভাইরাস সংক্রমণের পর একজন রোগীর শরীরে ওই ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক নিয়মে ভাইরাস প্রতিরোধী একধরনের প্রোটিন তৈরি হয়, যা অ্যান্টিবডি নামে পরিচিত। এই অ্যান্টিবডি থাকে রক্তের জলীয় অংশ বা প্লাজমাতে। রক্তের প্রায় ৫৫% হলো রক্তরস বা প্লাজমা। ভাইরাসটি থেকে সম্পূর্ণভাবে সেরে ওঠার পর ওই রোগীর শরীর থেকে যে প্লাজমা সংগ্রহ করা হয়, তার নামই হচ্ছে ‘কনভ্যালেসেন্ট প্লাজমা’।

এই প্লাজমা ওই একই ভাইরাসে আক্রান্ত অন্য একজনের শরীরে শিরাপথে প্রবেশ করিয়ে যে চিকিৎসা দেওয়া হয়, তাকেই বলা হয় ‘কনভ্যালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপি’। যেহেতু এই প্লাজমাতে ভাইরাস প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি আছে এবং তা সেরে ওঠা একজন রোগীর শরীর থেকে সংগ্রহ করে তা দিয়ে অন্য একজন আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা করা হয় , সে কারণে একে ‘প্যাসিভ অ্যান্টিবডি থেরাপি’ও বলা যায়।

চিত্রঃ প্লাজমা
Source: Google.com

প্লাজমা থেরাপির ইতিহাস:
অষ্টাদশ খ্রিষ্টাব্দে এ চিকিৎসাপদ্ধতির প্রচলন হয়। জার্মান চিকিৎসক এমিল ভন বেরিং ১৮৮০ সালে সর্বপ্রথম ডিপথেরিয়া রোগের চিকিৎসা দিয়েই এ পদ্ধতির গোড়াপত্তন করেন।
পরবর্তীতে ১৯২০ সালে এই প্লাজমা স্কারলেট ফিভার চিকিৎসায়ও ব্যবহৃত হয়। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত হুপিং কাশি রোগের চিকিৎসা এ প্লাজমা থেরাপির মাধ্যমেই দেওয়া হয়। ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লু মহামারীর সময় এই কনভ্যালেসেন্ট প্লাজমা অন্যতম চিকিৎসা পদ্ধতি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এরপর হাম, মাম্পস, ইনফ্লুয়েঞ্জা, জলবসন্তের চিকিৎসায়ও প্লাজমা থেরাপি দেওয়া হয়। যদিও ফলাফল ছিল মিশ্র প্রকৃতির।
নিকট অতীতে ২০০৩ সালে সার্স, ২০০৯ সালে বার্ড ফ্লু, ২০১২ সালে মার্স করোনাভাইরাস এবং অতি সম্প্রতি ২০১৩ সালে ইবোলা ভাইরাস চিকিৎসায় কনভ্যালেসেন্ট প্লাজমা ব্যবহৃত হতে দেখা গিয়েছে।
কার্য প্রক্রিয়া :
কনভ্যালেসেন্ট প্লাজমায় যে নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডি থাকে, তা আক্রান্ত রোগীর ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন রিসেপ্টরের সাথে আবদ্ধ হয়ে সংক্রমণ করার পথ বন্ধ করে। এ ছাড়া এ প্লাজমা ভাইরাসের প্রদাহী প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং অন্যান্য প্লাজমা উপাদান যেমন- কমপ্লিমেন্ট, ক্লটিং ফ্যাক্টর, সাইটোকাইন প্রভৃতি রোগীর শরীরের ভাইরাস বিরোধী ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয়।
সুস্থ হওয়া করোনা রোগীর প্লাজমা দানের পূর্বশর্ত :
১. আক্রান্ত ব্যাক্তি সুস্থ হবার পর ২৮ দিন অতিবাহিত হতে হবে।
২. অথবা, আক্রান্ত ব্যাক্তি উপসর্গ মুক্তির নুন্যতম ২৪ ঘন্টা ব্যবধানে পর পর দুইটি নেগেটিভ RT-PCR টেস্টের ২য় টির ফলাফল নেগেটিভ আসার পর ১৪ দিন অতিবাহিত হতে হবে।
তবে সাম্রতিক সময়ে FDA ( Food and Drug Administration) বলছে উপসর্গ ছাড়া ১৪দিন অতিবাহিত করলে প্লাজমা দেওয়া যাবে।
৩. যেসব মহিলা কখনো গর্ভধারণ করেছেন তারা প্লাজমা দানের জন্যে উপযুক্ত নন।
৪. করোনা থেকে সুস্থ হওয়া ব্যাক্তির প্লাজমা সংগ্রহের পূর্বে তার রক্তে যথেষ্ট পরিমাণে অ্যান্টিবডি আছে কিনা তা অ্যান্টিবডি টাইটার টেস্টের মাধ্যমে দেখতে হবে। টাইটার নূন্যতম ১:১৬০ হতে হবে।
৫. রক্ত দেওয়ার জন্যে স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে যেসব পরীক্ষা করা হয় সেগুলাতেও নেগেটিভ আসতে হবে। যেমন: হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস- সি, ম্যালেরিয়া, সিফিলিস, এইচআইবি।
৬. প্লাজমা দাতার বয়স ১৮-৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে এবং ওজন ৫০ কেজি অপেক্ষা বেশী হতে হবে।
কাদের জন্যে বেশী প্রযোজ্য:
অক্সিজেন সেচুরেশন এর মাত্রা ৯৩% এর নীচে নেমে গেলে।
তীব্র শ্বাসকষ্ট ( মিনিটে ৩০ এর বেশী রেস্পাইরেটরি রেট)।
আইসিউতে ভর্তি রোগী।

প্লাজমা যেভাবে সংগ্রহ করা হয় :
করোনা রোগ থেকে সেরে ওঠার ১৪ দিন পর এফেরেসিস মেশিনের সাহায্যে ওই ব্যক্তির শরীর থেকে ৪০০ থেকে ৬০০ মিলিলিটার প্লাজমা সংগ্রহ করা হয়। এই পদ্ধতিতে রক্তকণিকা (আরবিসি, ডব্লিউবিসি ও প্লেটলেট) প্লাজমাদাতার শরীরে ফিরে যায়। অর্থাৎ, তা সংগৃহীত হয় না, শুধুই প্লাজমাই নেওয়া হয়।
তবে যেসব জায়গায় এই এফেরেসিস মেশিন নেই, সেখানে এক ব্যাগ ব্লাড (হোল ব্লাড) সংগ্রহ করে সেন্ট্রিফিউজ করে প্লাজমা আলাদা করা হয়।
তবে সেক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হলো ঐ ব্যক্তি থেকে পরবর্তী ৩-৪ মাসের মধ্যে আর রক্ত সংগ্রহ করা যাবে না। কারণ সেন্ট্রিফিউজ পদ্ধতিতে প্লাজমা সংগ্রহের পর ররক্তকণিকা গুলো পুনরায় রোগীর শরীরে ফিরিয়ে দেয়া হয় না। অন্যদিকে এফেরেসিস মেশিনে রোগীর শরীর থেকে সরাসরি প্লাজমা সংগ্রহ করা হয় এবং ৭-১৪ দিন পর প্রয়োজনে আবার প্লাজমা নেয়া যায়।

চিত্রঃ এফেরেসিস মেশিন এ প্লাজমা সংগ্রহ
Source: Google.com


কতবার প্লাজমা দান করতে পারবেন:
যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন এর মতে, একজন ব্যাক্তি প্লাজমা দান করার ৪৮ ঘন্টা পর পুনরায় প্লাজমা দান করতে পারবেন। অর্থাৎ সপ্তাহে ২-৩ বার চাইলেই আপনি প্লাজমা দিতে পারেন নিরাপদে। এজন্যে শুধু বেশী করে পানি, পুষ্টিকর তরল এবং স্বাভাবিক খাবার খেলেই হবে। তারপরও কেউ আশংকিত হলে, সুস্থ অবস্থায় সপ্তাহে অন্তত ১বার প্লাজমা দান করতে পারবেন।
যেভাবে প্লাজমা দেওয়া হয়:
প্রতি ডোজে ২০০মিলি করে প্লাজমা দেওয়া হয় এবং সর্বোচ্চ ১ ঘন্টার মধ্যে রোগীর শরীরে সঞ্চালন করা হয়। প্রয়োজন হলে ৩য় দিন আরো ১ডোজ অর্থাৎ ২০০মিলি প্লাজমা দেওয়া হয় যদি রোগীর পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটে।
কতটা সফল প্লাজমা থেরাপি:
এটি আসলে পরীক্ষামূলক একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতির সাফল্য ব্যাপক ক্লিনিকাল ট্রায়ালে এখনো সম্পূর্ণ প্রমাণিত নয়। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে মূলত সংক্রমণের শুরুর দিকে এটি অধিক কার্যক। তারপরও এটির মধ্যে কিছু সম্ভাবনা দেখছেন বিজ্ঞানীরা।
অনুমোদন:
যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। কেবল গুরুতর অসুস্থ কোভিড-নাইনটিন রোগীদের জরুরী চিকিৎসায় ডাক্তাররা এই থেরাপি ব্যবহার করতে পারবেন বলে জানাচ্ছে লস এঞ্জেলস টাইমস। যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন মেথডিস্ট হাসপাতাল প্রথম এই থেরাপি ব্যবহার করেছে।

Leave a comment

Share via
Copy link