ইপিআই (EPI- Expanded Programme on Immunization):
ইপিআই বা সম্প্রসারিত টিকা দান কর্মসূচি হল বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা (WHO) কর্তৃক টিকা দান কর্মসূচি যার লক্ষ্য সারা পৃথিবীর সকলকে এই কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসা। বাংলাদেশ সরকার সহ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র কর্তৃক শিশুদের সংক্রামক রোগগুলোর মৃত্যু হার কমানোর জন্যে WHO পরিচালিত চলমান কর্মসূচি এটি।
ইপিআই (EPI)- কর্মসূচির ইতিহাসঃ
১৯৭৪ সালের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা (WHO) ইপিআই কর্মসূচি চালু করেন। ১০বছর পর ১৯৮৪ সালে বিশ্ব ব্যাপী শিশুদের টিকা কর্মসূচির পরিকল্পনা করে। ১৯৯৯ সালের মধ্যে সমগ্র গরীব দেশে কর্মসূচিটি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যে GAVI (Global Alliance for Vaccination & Immunization) গঠন করে। পরবর্তীতে UNICEF, World Bank, Gates Foundation সহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসংস্থা ও NGO সহযোদ্ধা হিসেবে কাজ আরম্ভ করে।
বাংলাদেশে ইপিআই (EPI)- কর্মসূচিঃ
১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল বাংলাদেশের ৮টি থানায় এই কর্মসূচি শুরু করা হয়। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ইপিআই অন্তর্ভুক্ত এলাকার পরিধি ২% এর ও কম ছিল। ১৯৮৫-১৯৯০ সালের মধ্যে বিভিন্ন ধাপে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশের ৪৭৬টি উপজেলা, ৯২টি পৌরসভা, ৬টি সিটি কর্পোরেশন ইপিআই এর আওতায় আসে। ১৯৯০ সালের মধ্যেই সকল শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের ইপিআই এর আওতায় আনা হয়।
ভ্যাক্সিন বা টিকা কি?
মানবদেহে কোন জীবাণু প্রবেশ করলে এর বিরুদ্ধে ইম্যিউনিটি (নিরাপত্তা) সৃষ্টি করার জন্য কৃত্রিমভাবে যা প্রদান করা হয় তাই ভ্যাক্সিন (Vaccine)। পৃথিবীজুড়ে স্মলপক্স (Smallpox) রোগ সম্পূর্ণ নির্মূল এবং পোলিও (Poliomyelitis), হাম (Measles) বা ধনুষ্টংকার (Tetanus)- এর মত রোগের প্রায় নির্মূলকরণ সম্ভব হয়েছে ভ্যাক্সিনেশন (Vaccination) বা টিকা প্রদানের মাধ্যমে। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার তথ্যমতে ২৫ টি রোগ আছে যাদেরকে ভ্যাক্সিনের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ভ্যাক্সিনের ইতিহাসঃ
৪২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডিডেস (Thucydides) লক্ষ্য করেন যে, এথেন্স শহরে যেসব রোগী স্মলপক্স আক্রান্ত হবার পর বেঁচে যাচ্ছে তাদের পুনরায় আর এই রোগটি হচ্ছে না। পরবর্তীতে চীনারা সর্বপ্রথম ১০ম শতাব্দীর শুরুতে ভ্যাক্সিনেশন এর আদিরূপ ভ্যারিওলেশন (Variolation) আবিষ্কার করে। এই প্রক্রিয়ায় স্মলপক্স রোগে আক্রান্তদের দেহের পাঁচড়া (Scrab) হতে টিস্যু নিয়ে সুস্থ মানুষদেরকে এর সংস্পর্শে আনা হত। ধীরে ধীরে তুরস্ক এবং ইংল্যান্ডেও ভ্যারিওলেশন বিস্তার লাভ করে। ১৭৯৬ সালে বৃটিশ চিকিৎসক ডাঃ এডওয়ার্ড জেনার আধুনিক ভ্যাক্সিনেশন আবিষ্কার করেন, এজন্যে তাঁকে “ফাদার অব ইম্যিউনোলোজি” বলা হয়। শিক্ষানবীশকালে জেনার লক্ষ্য করেন যে গ্রাম্য এলাকায় গোয়ালাদের স্মলপক্স হয় না কারণ ইতোমধ্যেই তারা কাউপক্স আক্রান্ত হয়ে আছে। ১৭৯৬ সালে তিনি এক গোয়ালিনীর হাত হতে পুঁজ নিয়ে ৮ বছর বয়সী এক ছেলের বাহুতে আঁচড়ে দেন এবং ৬ সপ্তাহ পর তার শরীরে স্মলপক্স জীবাণু প্রবেশ করান। সৌভাগ্যবশত বাচ্চাটির স্মলপক্স হল না। জেনার আরো গবেষণা করতে থাকেন এবং ১৭৯৮ সালে তিনি ঘোষণা করেন যে, স্মলপক্স ভ্যাক্সিন বাচ্চা-ছেলে-বুড়ো সবার জন্য নিরাপদ। পরবর্তীতে ১৮৮০ সালে লুই পাস্তুর জলাতঙ্কের(Rabies) ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করেন এবং ভ্যাক্সিন জগতে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসেন। সময়ের সাথে সাথে বিজ্ঞানীরা যখন বিভিন্ন রোগের কার্যকারণ আবিষ্কার করতে থাকেন তখন ভ্যাক্সিন তৈরীর পথও সুগম হয়ে যায়। জার্মান বিজ্ঞানী এমিল ভন বেহরিং ডিপথেরিয়া চিকিৎসায় ব্যবহৃত সিরাম থেরাপি (Serum therapy) আবিষ্কারের জন্য ১৯০১ সালে নোবেল পুরুষ্কার লাভ করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিনিই প্রথম নোবেল পুরস্কার পান। জাপানী চিকিৎসক শিবাসাবুরো কিতাসাতো ডিপথেরিয়া এবং ধনুষ্টংকারের ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করেন।
কর্মসূচিঃ
| রোগের নাম | টিকার নাম |
| ১. যক্ষা ২. পোলিও-মাইলাইটিস ৩. ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার, হিমোফাইলাস বি ইনফ্লুয়েঞ্জা, হেপাটাইসিস বি ৪. নিউ্যমোকক্কাল নিউ্যমোনিয়া ৫. হাম ও রুবেলা ৬. ধনুষ্টংকার | ১. বিসিজি ২. ওপিভি ৩.পেন্টাভেলেন্ট ৪. পিসিভি ৫. এম আর ৬. টিটি |
ইপিআই এর সময়সূচিঃ

- Save
চিত্রঃ ইপিআই সময়সূচি
Source: PediMedicine.com
ইপিআই এর আরও একটি উদ্দেশ্য হল শিশুদের সাথে সাথে জন্মদাতা মায়েদের
মৃত্যুহার কমানো ধনুষ্টংকার রোগ হতে। মহিলাদের জন্মদানে সক্ষম বয়স হতে টিটি
টিকা প্রদানের মাধ্যমে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা করা হয়।
ধনুষ্টংকার (Tetanus) ডোজঃ
১৫-৪৯ বছর বয়সের নারীদের দিতে হয়- ৫ টি ডোজঃ
টিটি-১: ১৫ বছর
টিটি-২: টিটি-১ এর কমপক্ষে ২৮ দিন পর
টিটি-৩: টিটি-২ এর কমপক্ষে ৬ মাস পর
টিটি-৪: টিটি-৩ এর কমপক্ষে ১ বছর পর
টিটি-৫: টিটি-৪ এর কমপক্ষে ১ বছর পর
গর্ভাবস্থায় টিটি (ধনুষ্টংকার) টিকাঃ
গর্ভাবস্থায় মায়েদের টিটি ভ্যাক্সিন দেওয়া হয় মাতৃকালীন এবং নবজাতক ধনুষ্টংকার প্রতিরোধের জন্যে। যদি কোন গর্ভবতী মা পূর্বে টিটি টিকা সম্পূর্ণ করে থাকলে গর্ভাবস্থায় তার টিটি টিকা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। অন্যথায়, ১ম গর্ভাবস্থায় ২টি ডোজ দিতে হয়। ১ম ডোজ দিতে হয় ২০-৩২ সপ্তাহের মধ্যে এবং ২য় ডোজ দেওয়া হয় ১ম ডোজের ৪ সপ্তাহ পরে (২য় ডোজ গর্ভাবস্থার প্রত্যাশিত তারিখ এর কমপক্ষে ৪ সপ্তাহ আগে দেওয়া উচিত)।
সরকারীভাবে ইপিআই ছাড়াও বেসরকারি পর্যায়ে আরো নানা ধরণের ভ্যাক্সিন দেয়া যায়। দেড় মাস বয়সে কলেরা ভ্যাক্সিন, ১২ মাস বয়সে চিকেন পক্স (জলবসন্ত), ১৮ মাস বয়সে হেপাটাইটিস এ, দুই বছর বয়সে টাইফয়েড দেয়া যায়। এছাড়াও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনফ্লুয়েঞ্জা, মেনিনজাইটিস এবং জলাতঙ্ক (র্যাবিস) ভ্যাক্সিন দেয়া যাবে।
বাংলাদেশে ইপিআই এর ধারাবাহিক কার্যক্রম সমূহঃ
১. বাংলাদেশে ইপিআই কর্মসূচি আরম্ভ হয় ৭ এপ্রিল ১৯৭৯ সালে।
২. টিটি (ধনুষ্টংকারের টিকা) চালু হয় ১৯৯৩ সালে।
৩. হেপাটাইটিস-বি চালু হয় ২০০৩ সালে।
৪. এডি (AD- auto disable) সিরিঞ্জ ব্যবহার চালু হয় ২০০৪ সালে।
৫. পেন্টাভেলেন্ট টিকা চালু হয় ২০০৯ সালে।
৬. এমআর (মিসলস-রুবেলা) এবং মিসলস ২য় ডোজ চালু হয় ২০১২ সালে।
৭. বাংলাদেশ সহ SEAR (South East Asian Region) অঞ্চলভুক্ত ১১টি দেশকে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা পোলিও মুক্ত ঘোষনা করে ২৭ মার্চ ২০১৪ সালে।
৮. নিউ্যমোকক্কাল কনজুগেট ভ্যাক্সিন চালু হয় ২০১৫ সালে।
৯. আইপিভি ভ্যাক্সিন চালু হয় ২০১৫ সালে।
১০. ৯২% শিশু নবজাতক ধনুষ্টংকার রোগ হতে নিরাপদ।
১১. হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (hpv) ভ্যাক্সিন চালু করা হয় ২০১৬ সালে।
১২. ২০১৮ সাল হতে রোটা ভাইরাসের বিপক্ষে বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়।
ইপিআই / ভ্যাক্সিনেশনের প্রভাবঃ
২০১২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার তথ্যমতে প্রতিবছর ভ্যাক্সিনেশনের ফলে আড়াই মিলিয়ন মৃত্যু প্রতিরোধ হয়। ভ্যাক্সিনেশনের পরিপূর্ণ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতি সাতটির মধ্যে একটি শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ সম্ভব। এটা বলা যায় যে শিশুকালে যেসব রোগের ভ্যাক্সিন দেয়া হয় তা মোটামুটি ৯০-১০০% ইম্যুনিটি তৈরী করতে পারে। আরেকটি মজার ব্যপার হল, একটি কম্যুনিটির বেশীরভাগ (মোটামুটি ৮০-৮৫%) মানুষকে ভ্যাক্সিনেশন করা গেলে ঐ কম্যুনিটির প্রায় সব সদস্য একই রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা লাভ করে (Herd immunity/Community immunity)। এই প্রক্রিয়ায় ইনফ্লুয়েঞ্জা, হাম ইত্যাদি রোগের প্রতিরোধ করা যায়।



