আতাকামা মরুভূমি: পৃথিবীর বুকে এক খণ্ড মঙ্গল গ্রহ

2,359 Views

যুগ যুগ ধরে সৌরজগতের লাল গ্রহ মঙ্গল নিয়ে মানুষের জল্পনা কল্পনার শেষ নেই। বিখ্যাত মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে চলেছে লাল গ্রহের রহস্য উদঘাটন করতে। বিজ্ঞানীরা ভাবছেন যে ভবিষ্যতে পৃথিবীর পর মঙ্গল গ্রহ হবে  মনুষ্য কলোনি যুক্ত ২য় গ্রহ। কলোনি স্থাপনরের অংশ হিসেবে নিকট ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর কর্মসূচী হাতে নিয়েছে নাসা। কিন্তু কেমন হয় যদি পৃথিবীতেই আপনি পেয়ে যান মঙ্গল গ্রহের স্বাদ? পুরোপুরি মঙ্গল গ্রহ না হলেও মঙ্গল গ্রহের সাথে  ভূমিগত মিল রয়েছে আতাকামা মরুভূমির। প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ের দেশ চিলি যা দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের অন্তর্গত পৃথিবীর সবচেয়ে সরু রাষ্ট্র। এই চিলিতেই রয়েছে মঙ্গল গ্রহের বৈশিষ্ট্যময় পৃথিবীর শুষ্ক ও রুক্ষ আতাকামা  মরুভূমি। যার বেশ কিছু অংশে বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত কোন বৃষ্টিপাতের চিহ্ন খুঁজে পাননি।  

ভৌগোলিক অবস্থান 

আতাকামা মরুভূমি দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের আন্দিজ পর্বতমালার পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ে প্রায় ৪৯০০০ বর্গ মাইল জুড়ে বিস্তৃত। যার বেশিভাগ জায়গা উচু নিচু পাথুরে ভূমি। কিছু কিছু অংশ লবণের হ্রদ এবং বালুময়।  সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর গড় উচ্চতা ২৪০৯ মিটার। কোথাও কোথাও এটি ৪৯০০ মিটার পর্যন্ত উচু।

জলবায়ু 

অধিক উচ্চতার পাহাড় এর কারণে প্রশান্ত বা আটলান্টিক কোন মহাসাগর থেকেই জলীয় বাষ্প এখানে পৌঁছাতে পারে না। ফলে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১ মিলিমিটার এরও কম হয় এখানে। কিছু অংশে ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। এমনকি কিছু কিছু অংশে কখনো বৃষ্টি হয়েছে এমন রের্কড পাওয়া যায় না। এই অস্বাভাবিক বৃষ্টিহীনতা এই মরুভূমিকে পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক জায়গায় গুলোর একটিতে পরিণত করেছে। এটি এতই শুষ্ক যে ৬০০০ মিটারের অধিক উচ্চতার পাহাড় গুলোতেও হিমবাহ বা গ্লেসিয়ার নেই।  তবে ২০১৫ সালের হঠাৎ ভারি বৃষ্টিপাত আতাকামা মরুভূমির দক্ষিণ আংশে তীব্র বন্যার সৃষ্টি করে। ফলশ্রুতিতে ১০০ এর বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

জীববৈচিত্র্য

আতাকামা মরুভূমির কিছু কিছু অংশ এতই শুষ্ক যে সেখানে কোন উদ্ভিদ বা প্রাণী বাঁচতে পারে না। এসবের বাহিরেও সম্পূর্ণ মরুভূমির আবহওয়া অত্যন্ত চরমভাবাপন্ন। বৈরি জলবায়ু ও ভৌগোলিক অবস্থানের পরও আতাকামা মরুভূমি ৫০০ এর অধিক উদ্ভিদ এবং অনেকগুলো প্রাণীর বাসস্থান। এসব উদ্ভিদ ও প্রাণীরা অসাধারণভাবে এই চরমভাবাপন্ন পরিবেশেও নিজেদের অভিযোজিত করেছে। এখানকার বেশিরভাগ উদ্ভিদই ঘাস জাতীয় এবং লতানো। এখানে রয়েছে ল্যারেটা (llareta) যা পৃথিবীর অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল কাষ্ঠল উদ্ভিদ এটি সাধারণত ৩০০০ থেকে ৫০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে পাওয়া যায়। কিছু ক্যাকটাস জাতীয় উদ্ভিদও পাওয়া যায় মরুভূমির বিভিন্ন অংশে। বছরে এক বার দুর্লভ বৃষ্টিপাতের পর পর মরুভূমি জুড়ে দেখা যায় এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। মরুর বুক আলোকিত করে একসাথে ফুটে উঠে অসংখ্য ফুল। যা এই মরুভূমির অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ। প্রাণীকুলের মধ্যে রয়েছে এক প্রকার ঘাসফড়িং যাদের গায়ের রং সম্পূর্ণ বালুর মত। দেখে বুঝার উপায় থাকে না বালি কণা না কি ঘাসফড়িং। রয়েছে অসংখ্য পোকামাকড়। এই কঠিন পরিবেশেও কিছু সরীসৃপ বেঁচে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে। এদের বেশিরভাগ অবশ্য টিকটিকি বা লিজার্ড জাতীয়।

Flowering at Atacama desert after sudden rain.
  • Save

চিত্রঃ এক পশলা বৃষ্টির পর মরুভূমি জুড়ে প্রাণের সঞ্চার
source: Wikipedia.org

  • Save

চিত্রঃ আতাকামা  মরুভূমির এন্ডেমিক সরীসৃপ
Source: Wikipedia.org

খনিজ সম্পদ 

আতাকামা মরুভূমির উত্তর অংশে রয়েছে মূল্যবান খনিজ সম্পদের খনি। বলিভিয়া এবং চিলির মধ্যে এই খনিজ সম্পদের দাবিদার নিয়ে ১৮৭৯ থেকে ১৮৮৪ সাল পর্যন্ত যুদ্ধ হয়। যা প্রশান্ত মহাসাগরীয় যদ্ধ নামে পরিচিত। পরবর্তীতে চিলি বিজয় দাবি করে এবং ঐ অঞ্চলের দখল নেয়। ২০১০ সালে এই অঞ্চল আবার প্রদীপের আলোয় আসে এক বিশ্বখ্যাত খনি দূর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যা “কপিওপি খনি দূর্ঘটনা” নামে পরিচিত। যেখানে ৩৩ জন শ্রমিক ১২০ বছরের পুরানো তামা ও সোনার খনিতে আটকা পড়ে। দূর্ঘটনার ৬৯ দিন পর ১৩ অক্টোবর ২০১০ এ  শ্রমিকদের সবাইকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধারে সক্ষম হয় কতৃপক্ষ। এতদিন ভূমি থেকে ২৩০০ ফুট নিচে অবস্থান করে শ্রমিকরা। এই উদ্ধার কাজে অংশ নেয় নাসা এবং চিলির নৌবাহীনি। 

  • Save

চিত্রঃ মরুভূমি এলাকায় তামার খনি
Source: Wikipedia.org

মঙ্গল গ্রহের সাথে তুলনা

ধারণা করা হয় আতাকামা মরুভূমি প্রায় ৩ মিলিয়ন বছর ধরে অধিক শুষ্কতার মুখোমুখি হয়ে টিকে আছে। যা এটিকে পৃথিবীর মরুভূমির গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় শুষ্ক অঞ্চলে পরিণত করেছে। এন্তোফাগাস্তার দক্ষিণে প্রায় ১০০ কিলোমিটার অঞ্চল যার অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড়ে ৩০০০ মিটার উচ্চতায়, এই অঞ্চলের মাটিকে মঙ্গল গ্রহের মাটির মত ধরা হয়। ২০০৩ সালের এক গবেষণা মতে, এখানকার মাটির সাথে পৃথিবীর কোন অংশের মাটির মিল পাওয়া যায় না। গবেষকরা এখানকার মাটিতে কোন জীবনের চিহ্ন পাননি। একমাত্র মঙ্গল গ্রহের মাটিতে অনুরুপ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। পরবর্তীকালে নাসা তাদের ভবিষ্যৎ মঙ্গল মিশনের যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে এ অঞ্চলে। এরপর থেকে পৃথিবী ও মঙ্গলের সাদৃশ্যতা খুঁজতে এখানে গবেষণা চালিয়ে আসছে নাসা। এছাড়াও বিভিন্ন টিভি সিরিজ এবং সিনেমাতে মঙ্গল গ্রহের দৃশ্য ধারণের নিয়মিত শ্যুটিং হয় এখানে। 

  • Save

চিত্রঃ মঙ্গল গ্রহের মত লাল মাটি
Source: Wikipedia.org

মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র

অত্যধিক উচ্চতা, শুষ্ক বাতাস এবং মেঘ মুক্ত আকাশ, শহুরে আলো ও রেডিও সিগন্যাল থেকে দূরে হওয়ার কারণে আতাকামা মরুভূমি পৃথিবী থেকে মহাকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য অন্যতম ভলো স্থান। ২০১১ সালে বিভিন্ন দেশের মহাকাশ গবেষণা  সংস্থা গুলোর সমন্বয়ে “আতাকামা লার্জ মিলিমিটার এ্যারে নামে” একটি রেডিও টেলিস্কোপ চালু করা হয়। ইউরোপিয়ান সাউর্দান অভজারভেটরি বা ইএসও এর তিনের অধিক পর্যবেক্ষণ প্রজেক্ট চলমান আছে। এছাড়াও আরো অনেকগুলো মহাকাশ গবেষণা প্রজেক্ট ১৯৯৯ সাল থেকে এখানে চালু রয়েছে। 

  • Save

চিত্রঃ আতাকামা মরুভূমি থেকে  মহাকাশ পর্যবেক্ষণ 
Source: Wikipedia.org

খেলাধুলা ও পর্যটন 

আতাকামা মরুভূমি উচু নিচু ভূগঠনের কারণে বিভিন্ন রকম কার রেস, সাইকেল রেস খেলার জন্য জনপ্রিয়। অনেকগুলো প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যে এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়াও সপ্তাহব্যাপী পায়ে হেঁটে বিভিন্ন ভূ-গাঠনিক ভূমি অতিক্রম প্রতিযোগিতা, ভলকানো ম্যারাথন প্রতিযোগিতা যা মরুভূমির  লাসকর আগ্নেয়গিরির নিকটে অনুষ্টিত হয়। আতাকামা মরুভূমি চিলির প্রথম তিনটি পর্যটন প্রিয় জায়গা গুলোর একটি। বিশেষত, হঠাৎ বৃষ্টিপাতের পর মরুভূমি জুড়ে ফুলের মেলা দেখতে প্রতিবছর শত শত পর্যটক ছুটে যায় আতাকামার শুষ্ক প্রান্তরে। 

  • Save

চিত্রঃ মরুভূমির বুকে কার রেস খেলা
Source: Wikipedia.org

Let’s scrutinize past and present to see what’s waiting in the future.

Leave a comment

Share via
Copy link