ট্রেন টু পাকিস্তান (খুশবন্ত সিং)

2,090 Views

উপমহাদেশের ইতিহাসে ১৯৪৭ সালের দেশ-বিভাগ অসম্ভব তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা। ধারণা করা হয়, পার্টিশনের ফলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রাণ হারায় প্রায় দশ লক্ষাধিক মানুষ। শুধুমাত্র ধর্মের পার্থক্যের কারণে ভারত-পাকিস্তানের প্রায় এক কোটি মানুষ লিপ্ত হয় এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। ট্রেন টু পাকিস্তান উপন্যাসে খুশবন্ত সিং মূলত সেই সময়কার ভয়াবহতাই তুলে ধরেছেন।

সীমান্তবর্তী ছোট্ট গ্রাম মানো মাজরা মূলত শিখ অধ্যুষিত হলেও মুসলিম এবং শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে বাস করতো। ফজরের আজান এবং গুরুদোয়ারা থেকে শিখদের প্রার্থনা ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ঊষার আহবান জানাতো প্রতিটি ভোরে। তবে হঠাৎ করেই উপমহাদেশ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাওয়ায় অস্বস্তিকর এক পরিস্থিতি তৈরি হয় মানো মাজরায়। রেলস্টেশনের কোলাহল কিংবা হুইসেল-কেন্দ্রিক জীবনে অভ্যস্ত হওয়া সহজ সরল মানুষগুলোর জীবন পাল্টে যায় চিরদিনের মত। আর বহুদিনের পরিচিত ট্রেনগুলো একেকটি মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হতে থাকে।

খুশবন্ত সিং ব্যক্তিজীবনে ধর্মের বিভাজনে বিশ্বাসী নন, বরং মানবিকতাকেই তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে বিশ্বাস করেন। অথচ আমাদের উপমহাদেশে উগ্র ধর্মান্ধতা বেশ প্রাচীন ব্যাধি, তীর্যক মন্তব্যে বারবার এমনটাই প্রকাশ করেছেন লেখকঃ

প্রমাণ পাশ্চাত্যের ধারণা। আমরা প্রাচ্যের রহস্যময়তার মধ্যে আছি। প্রমাণের প্রয়োজন নেই, বিশ্বাসই বড় কথা! যুক্তির কথা অবান্তর; চাই বিশ্বাস।

গল্পের প্রধান চরিত্র কোনটি তা নিয়ে সংশয় আছে। শুরুর দিকে জুগগা এবং নুরানের প্রেমকে মূল উপজীব্য মনে হলেও, শেষ পর্যন্ত এমনটি ছিল না। ইকবাল চরিত্রটি আরেকটু সুগঠিত হতে পারতো, কিন্তু অহমিকার প্রচ্ছন্ন এক আবেশে এই চরিত্রটি বলিষ্ঠভাবে মূল ঘটনার সাথে সংযুক্ত হতে পারেনি কখনোই। হুকুম চাঁদ চরিত্রটিকে ভাল কিংবা মন্দের হিসেবে ফেলা গেলো না, তবে নিঃসন্দেহে উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্রই বটে। জটিল মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে কৌশলী এই ম্যাজিস্ট্রেট উপমহাদেশের রাজনৈতিক কলকাঠি এবং শক্তিমত্তার পরিচায়ক। গুরুদুয়ারার ‘ভাই’ মিত সিং ধর্মকেন্দ্রিক চরিত্র হলেও প্রধানত সহজ-সরল গ্রামবাসীর প্রতিনিধিত্ব করে।

পঞ্চাশের দশকের হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা এই ভূখণ্ডকে পিছিয়ে দিয়েছে অনেকটাই। দুইশ’ বছর ইংরেজদের অধীনস্থ থাকার পর পাকিস্তান ও ভারতের জন্মের শুরুটা শুধুমাত্র ধর্মের বিভাজনের কারণেই বেশ রক্তাক্ত। সোভিয়েতপন্থী সমাজতান্ত্রিক মনোভাবে কিছু তরুণ দীক্ষিত থাকলেও প্রকৃতপক্ষে তা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে ব্যর্থ ছিল। সহসা আবির্ভূত কমরেডের উদাসীনতা এবং অপারগতা তেমনটিই ইঙ্গিত করেছে। তবে একটি ব্যাপার স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, সমাজের একটা বড় অংশের কাছেই স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল কখনো পৌঁছায় নি। এই মতবাদ আজকের সমাজের জন্যও সত্য অনেকাংশে, এবং মানো মাজরার সাধারণ গ্রামবাসীদের নিয়ে সেই আক্ষেপই ঝরে পড়েছে। কারণ স্বাধীনতার আগে তারা ছিল ইংরেজদের গোলাম, আর পরবর্তীতে হয়েছে হিন্দুস্তানী বা পাকিস্তানীদের গোলাম। পরাধীনতায় অভ্যস্ত এই মনোভাব যে কতটা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে সেটাও দেখা গেছে উপন্যাসের শেষের দিকে, যখন অচেনা দুষ্কৃতিকারীদের প্ররোচণায় আজীবনের সুহৃদকে হত্যায় উদ্বুদ্ধ হয় গ্রামবাসী। 

বিক্ষুব্ধ সেই সময়ে বর্শা কিংবা বন্দুকের সামনে মানবিকতার অসহায় আত্মসমর্পণ প্রতিটা চরিত্রকেই প্রভাবিত করেছে বিভিন্নভাবে। সেই সাথে উপন্যাস যত এগিয়েছে, ঘটনার পরিক্রমা তত গতিশীল হয়েছে। কিন্তু শেষের দিকে এসে অসম্পূর্ণ মনে হলো, গল্পের পরিণতি না ঘটিয়েই যেন উপন্যাসের যতি টেনেছেন লেখক। খুব সহজেই আরো কিছুদূর এগিয়ে নেয়া যেত, তবে লেখক হয়তো পাঠকের উত্তেজনার পারদ ওপরে উঠিয়েই বিদায় নিতে চেয়েছেন। থাকুক কিছু অপূর্ণতা।  

প্রকৃতি এবং সরল গ্রাম্য জীবনের বেশ কিছু বিবরণ রয়েছে বইয়ে, প্রতিটিই বেশ সাবলীল। পুলিশের খাতায় নাম ওঠানো ‘বদমাশ’ হিসেবে পরিচিত এক গ্রাম্য তরুণের যুক্তিহীন তীব্র প্রেম ছাপিয়ে যায় ধর্মান্ধতার অভিশাপ। সব মিলিয়ে বেশ গোছানো এবং বৈচিত্র্যময় একটি হিস্ট্রিকাল ফিকশন।

Simple and ambitious. I am always wishing to pay the bills with words.

Leave a comment

Share via
Copy link