শবনম (সৈয়দ মুজতবা আলী)

2,304 Views

পাঠ্যবইয়ের ‘রসগোল্লা’র মাধ্যমে সৈয়দ মুজতবা আলীর সাথে পরিচয়। পরিচয়পর্বটা আমাদের সমসাময়িক অনেকের জন্যই বোধ হয় সত্য। তবে পর্বটা সেখানেই শেষ না করে টেনে নিলাম বহুদূর, আজ অবধি। কারণ সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা মানে আমার কাছে অসম্ভব সুস্বাদু লঘুপাক এবং গুরুপাক খাবারের মিশ্রণ। হাস্যরস এবং জীবনবোধকে একই থালায় নিয়ে এসে অসাধারণ কিছু গল্পের উপস্থাপন, প্রকাশভঙ্গি।

আজ পর্যন্ত মুজতবা আলীর যতগুলো লেখা পড়েছি – শব্‌নমকে সেগুলোর কোনটার কাতারেই ফেলা যায় না। কাব্যধর্মী প্রণয়োপাখ্যান বললে বরং সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়া যেতে পারে। গল্পের পটভূমি আফগানিস্তানে, লেখকের আফগান-জীবনের অভিজ্ঞতার অনেকটাই যে উঠে এসেছে এ উপন্যাসের বর্ণনায় তা বলাই বাহুল্য।

বইয়ের একদম শুরু থেকেই বঙ্গদেশীয় যুবকের সাথে রূপে-গুণে অতুলনীয়া আফগান তরুণী শব্‌নমের প্রেমপর্বের সূত্রপাত। আমরা যাকে ফ্লার্ট বলি – সেটারই খুব উচ্চমার্গীয় কিছু উপস্থাপনার মাধ্যমে প্রণয় সামনে এগিয়ে গেছে। এদিক থেকে কিছু কিছু জায়গা অতি-নাটকীয়ও বলা যায়। কারণ আজকে থেকে প্রায় একশ’ বছর আগে মুসলিম-অধ্যুষিত দেশে, এক ভিনদেশী যুবকের সাথে আফগান তরুণীর এত সাবলীল আচরণ, সহসা বাসায় গিয়ে উপস্থিত হওয়া – রীতিমত বিস্ময়কর ঘটনাই বটে।
প্রথম পরিচয়েই বাঙালী যুবক তাই বলে বসেছিল, “এরকম মিষ্টি নামওয়ালী মেয়ে যা – খুশি বলার হক ধরে।”

সৈয়দ মুজতবা আলীর একটা স্টাইল হলো, অসাধারণ রেফারেন্সিং এবং ট্রিভিয়া। এখানেও সেই প্রমাণ রেখেছেন লেখক, সেই সাথে ফুটিয়েছেন কাব্যের ফুলঝুড়ি। কাবুল থেকে শুরু হলেও প্রেমের টানে মজনুন ছুটে গেছেন কান্দাহার, সেখান থেকে আবার ফিরেছেন কাবুলেই। ঘটনার ঘাত প্রতিঘাতে কখনো শব্‌নমকে কাছে পাওয়ার নেশায় বুঁদ হয়েছেন, কখনো আবার দগ্ধ হয়েছেন বিরহতাপে। দুটো প্রধান চরিত্রের মাঝেই কাব্যপ্রিয়তা উঠে এসেছে বেশ সুন্দরভাবে। পারস্যের রুমি, আমাদের কালিদাস, রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ উল্লেখে নরনারীর প্রেম ছাপিয়ে মিলন ঘটেছে দুই ভিন্ন সংস্কৃতিরও।

ভালোবেসে শব্‌নমকে কখনো হিমিকা কিংবা শরতের শিউলির সাথে তুলনা করা হয়েছে। প্রিয় মানুষের গালের টোলের গভীরতায় কখনো সুরাপান করতে চেয়েছেন প্রেমিক। একই সাথে শব্‌নমের নারীত্ব, প্রেম ও সৌন্দর্যের মোহাবিষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন লেখক পুরো উপন্যাসজুড়েই। প্রেমের তীব্রতায় ছাড়িয়ে গেছেন আফগান হিন্দুকুশ পর্বতমালা – পবিত্রতায় হার মানিয়েছেন কাবুলের শ্বেতশুভ্র তুষারপাতকেও। সেই ধারাবাহিকতায়, শব্‌নমের কণ্ঠের আকুলতায় বারবার ফুটে উঠেছেঃ আমার বিরহে তুমি অভ্যস্ত হয়ে যেও না।
উপন্যাস এগিয়েছে, এবং পরবর্তিতে একসময় তা পরিণত হয়েছেঃ আমার মিলনে তুমি অভ্যস্ত হয়ে যেও না।
এই দুই আহবানের মধ্যেই যেন বিস্তৃত পুরো উপন্যাস। কাছে আসা এবং হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেই প্রেমের ব্যাপ্তি। শারীরিক নৈকট্য থাকলেও কখনোই তা বড় হয়ে ওঠে নি এই প্রেমে, বরং শেষ পর্যন্ত বারবার প্রতীয়মান হয়েছে আত্মিক পরিতৃপ্তি। আত্মাকে বলা হয়েছেঃ অন্তরের অন্তরতম পরিপূর্ণ আনন্দকণা।

শব্‌নম চরিত্রটি আসলেই মুগ্ধ হবার মত। ইউরোপের শিক্ষা, প্রাচ্যদেশীয় সংস্কৃতির ভিত, সপ্রতিভ কথাবার্তা এবং কোমল-কঠোরের সংমিশ্রণ – সব মিলিয়ে শব্‌নম আজ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে এক অন্যতম সেরা চরিত্র আমি বলবো। ধনী রাজনৈতিক পরিবারের মেয়ে হিসেবে কাঠিন্য আছে, কিন্তু নেই অহমিকা। দেশের অস্থিতিশীল অবস্থায়ও বোরখার অন্তরালে উদ্যত রিভলভার নিয়ে তাই সে বের হয়ে পড়েছে বারবার, প্রণয়ের আকর্ষণে। বয়েত কিংবা কবিতার প্রতি সীমাহীন আকর্ষণ তার প্রেমের প্রকাশভঙ্গিকে করেছে কাব্যিক, সুললিত।

ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য সামান্য কিছু খোরাকও দিয়েছেন লেখক। বই পড়তে পড়তে একটু ঘেঁটে বুঝলাম যে ১৯২৯ সালের বাচ্চা-ই-সকাও বাহিনীর আবির্ভাব এবং তৎকালীন আফগান গৃহযুদ্ধকালীন অনিশ্চয়তা দেশের রাজনৈতিক পালাবদলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উপন্যাসের কাহিনীর বুননে এবং ঘটনার গতিশীলতায়ও এই ঘটনার তাৎপর্য অপরিসীম।
লাইলী-মজনুর প্রেমগাথার উল্লেখ আছে বেশ কয়েক জায়গায়, সবগুলোই ভাল লেগেছে। যেমনঃ

মজনু যখনই শুনত, তার প্রিয়া লায়লিকে নজদ্‌ মরুভূমির উপর দিয়ে উটে করে সরানো হচ্ছে সে তখন পাগলের মত এ উট সে-উটের কাছে গিয়ে খুঁজত কোন মহমিলে (উটের হাওদা) লায়লি আছে। মজনু মরে গেছেন কত শতাব্দী হল। কিন্তু এখনো তার জীবিতাবস্থার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস মরুভূমির ছোট ছোট ঘূর্ণিবায়ু হয়ে লায়লির মহমিল খুঁজছে। তুমি বুঝি কখনো মরুভূমি দেখো নি? ছোট ছোট ঘূর্ণিবায়ু অল্প অল্প ধূলি উড়িয়ে এদিকে ধায়, ওদিকে ধায়, ওদিকে ছোটে, সেদিকে খোঁজে।

না পড়ে থাকলে সর্বভুক পাঠকদের পড়ে ফেলা উচিত শব্‌নম। আর রোমান্টিক পাঠকদের জন্য তো এটা অবশ্য-পাঠ। শব্দশৈলীর দিক দিয়ে খুবই সমৃদ্ধ এই উপন্যাস। আরবী-ফারসী শব্দ তো আছেই, সংস্কৃতের ব্যবহারও রয়েছে। সুরেলা একটা আবহ রয়েছে পুরো লেখায়। তবে আধুনিক আটপৌরে বাংলার পাঠকদের জন্য একটু কঠিন মনে হতে পারে।

Simple and ambitious. I am always wishing to pay the bills with words.

Leave a comment

Share via
Copy link