স্যার ফজলে হাসান আবেদ – যে জীবন মানুষের

1,231 Views

স্যার ফজলে হাসান আবেদ ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী। তিনি বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি সংগঠন ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা। দারিদ্র্য বিমোচন ও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতিতে তার ভূমিকা অপরিসীম।

জন্ম ও পরিবার পরিচিতি:

ফজলে হাসান আবেদ ১৯৩৬ সালের ২৭ এপ্রিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত উপমহাদেশভুক্ত বাংলায় হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচংয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সিদ্দীক হাসান একজন ভূস্বামী ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম সৈয়দা সুফিয়া খাতুন। তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন ঐ অঞ্চলের জমিদার।

শিক্ষাদীক্ষা:

তিনি ১৯৫২ সালে পাবনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর তিনি ব্রিটেনের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেভাল আর্কিটেকচারে ভর্তি হয়েছিলেন। পরে সেটা বাদ দিয়ে তিনি লন্ডনের চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউনট্যান্টসে ভর্তি হন। ১৯৬২ সালে তিনি তাঁর প্রফেশনাল কোর্স সম্পন্ন করেন।

  • Save

চিত্র : যুবক বয়সে আবেদ
উৎস : প্রথম আলো

প্রারম্ভিক কর্মজীবন:

লন্ডন, কানাডা ও আমেরিকায় চাকরির পর ১৯৬৮ সালে তিনি দেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ফিরে আসেন এবং শেল অয়েল কোম্পানিতে যোগদান করেন। সেখানে দ্রুতই তিনি ফাইন্যান্স বিভাগের প্রধান হিসেবে পদোন্নতি পান। উক্ত কোম্পানিতে চাকরিকালীন ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ এতে মারা যায়। দুর্বিষহ এ সময়ে আবেদ তাঁর বন্ধুদের নিয়ে ‘হেলপ’ নামক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুত মনপুরা দ্বীপের অধিবাসীদের মাঝে ব্যাপক ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ইংল্যান্ডে চলে যান। সেখানে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়, তহবিল সংগ্রহ ও জনমত গঠনের লক্ষ্যে অ্যাকশন বাংলাদেশ এবং হেলপ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন।

ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা :

একাত্তর সালের ডিসেম্বর মাসে ফজলে হাসান আবেদ সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এ সময় তিনি তাঁর লন্ডনের ফ্ল্যাট বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে ত্রাণকাজ শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল ‘শাল্লা’কে বেছে নেন তিনি। এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায়ই ১৯৭২ সালে আবেদের বয়স যখন মাত্র ৩৬ বছর, তখন ব্র্যাক গড়ে ওঠে। প্রথমে ‘Bangladesh Rehabilitation Assistance Committee’ হিসেবে শুরু করলেও পরবর্তীতে BRAC এর পূর্ণরূপ হয় ‘Bangladesh Rural Advancement Committee’। যদিও বর্তমানে ব্যাখ্যামূলক কোনো শব্দসমষ্টির অপেক্ষা না রেখে এই সংস্থা শুধুই ‘BRAC’ নামে পরিচিত।

সংস্থার বিস্তার:

ভূমিহীন চরম দারিদ্র্যপীড়িত মানুষ, বিশেষ করে নারীরা যাতে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে নিজেরাই নিজেদের ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে উঠতে পারে, সেই লক্ষ্যে ব্র্যাকের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি পরিচালিত হতে থাকে। যার ধারাবাহিকতায় বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কৃষি, দক্ষতা বৃদ্ধি, ক্ষুদ্রঋণ প্রদান, মানবাধিকার, উন্নয়ন প্রভৃতি বিষয়ে এটির কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে।

২০০২ সালে ব্র্যাক আফগানিস্তানে তার কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে একটি আন্তর্জাতিক এনজিও হিসাবে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এশিয়া ও আফ্রিকার ১২টি দেশের অনন্য ভৌগোলিক এবং আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিকে বিবেচনায় রেখে সংস্থাটি সাফল্যের সাথে সেখানে উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এসব দেশে ব্র্যাকের লক্ষাধিক কর্মী প্রায় তেরো কোটি মানুষের জীবনমান পরিবর্তনে কাজ করে যাচ্ছে। এভাবেই প্রায় চার দশকের প্রচেষ্টায় এটি পরিণত হয় বিশ্বের সর্ববৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়। ফজলে হাসান আবেদের সুযোগ্য নেতৃত্বই অজস্র প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ব্র্যাকের অনন্য সাধারণ এই অর্জনকে সম্ভব করে তুলেছে।

এনজিও ছাড়াও ব্র্যাক এখন অন্যান্য খাতে শক্ত প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। ব্যাংকিং খাতে ব্র্যাক ব্যাংক (মোবাইল-ব্যাংকিং সেবা বিকাশ এর অংশ), নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইপিডিসি, উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে আড়ং, ব্র্যাক ডেইরি এন্ড ফুড প্রজেক্ট প্রভৃতি তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এভাবেই যুগোপযোগী বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে আবেদ প্রমাণ করেছেন যে ব্যবসা করেও মানুষের কল্যাণ সাধন করা যায়।

  • Save

চিত্র : প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে প্রাণপুরুষ আবেদের নিরন্তর প্রচেষ্টা
উৎস : ইউ. এস. ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

অসংখ্য পুরস্কার:

তিনি শিক্ষা ক্ষেত্রের নোবেল বলে খ্যাত ‘ইয়াইদান পুরস্কার’ (২০১৯), প্রাকশৈশব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য লেগো পুরস্কার (২০১৮), লুডাটো সি অ্যাওয়ার্ড (২০১৮), থমাস ফ্রান্সিস জুনিয়র মেডেল ইন গ্লোবাল পাবলিক হেলথ (২০১৬), বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার (২০১৫), স্প্যানিশ অর্ডার অব সিভিল মেরিট (২০১৪), লিও তলস্তয় আন্তর্জাতিক স্বর্ণ পদক (২০১৪), ওয়াইজ প্রাইজ ফর এডুকেশন (২০১১), গেটস ফাউন্ডেশনের বিশ্ব স্বাস্থ্য পুরস্কার (২০০৪), জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থার মাহবুব-উল-হক পুরস্কার, শোয়াব ফাউন্ডেশনের সামাজিক উদ্যোক্তা পুরস্কার, নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য ওলফ পাম প্রাইজ (২০০১), ইউনিসেফ মরিস পেট পুরস্কার (১৯৯২), ইউনেস্কো নোমা পুরস্কার (১৯৮৫), র‌্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফর কমিউনিটি লিডারশীপ (১৯৮০) সহ আরো অনেক পুরস্কার অর্জন করেছেন।

  • Save

চিত্র: আবেদ মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে থমাস ফ্রান্সিস জুনিয়র পদক গ্রহণ করছেন (এপ্রিল ২০১৬)
উৎস: দ্যা এশিয়ান এজ

উপাধি ও স্বীকৃতি:

২০১৭ ও ২০১৪ সালে ফরচুন ম্যাগাজিনের বিশ্বের ৫০ সেরা নেতার তালিকায় আবেদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। অশোকা তাঁকে বৈশ্বিক সেরাদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। তিনি স্বনামধন্য গ্লোবাল অ্যাকাডেমি ফর সোশ্যাল আন্ট্রোপ্রেনিওরশিপের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দারিদ্র্য বিমোচন এবং দরিদ্রের ক্ষমতায়নে বিশেষ ভূমিকার স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১০ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে সবচেয়ে সম্মানিত ‘Knight Commander of the Order of St Michael and St George’ (KCMG) উপাধিতে ভূষিত করে। বাংলাদেশের একমাত্র ‘নাইটহুড’ উপাধিপ্রাপ্ত ব্যক্তি তিনি।

অর্জিত ডিগ্রিসমূহ:

সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি অসংখ্য সম্মানসূচক ডিগ্রিতে ভূষিত হয়েছেন, তন্মধ্যে রয়েছে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব লজ (২০১৪), অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব লেটার্স (২০০৯), কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব লজ (২০০৮) ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট অব হিউমেন লেটার্স ( ২০০৭)।

অলঙ্কৃত পদসমূহ:

আবেদ ২০০১ সাল পর্যন্ত ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীতে ব্র্যাক বাংলাদেশ ও ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান হিসাবে দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে কল্যাণকর নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে আবেদ যোগ্য নেতৃত্বের হাতে ব্র্যাকের দায়িত্ব হস্তান্তর করে চেয়ার এমেরিটাস পদ গ্রহণ করেন।

ব্র্যাকের বাইরে ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত দি ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জেনেভার এনজিও কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯০ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত গণসাক্ষরতা অভিযান-এর চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এভাবেই আবেদ তার অভিজ্ঞতা দিয়ে জীবনভর অসংখ্য সংস্থাকে সাহায্য করেছেন।

বর্ণিল জীবনের পরিসমাপ্তি:

আবেদ মস্তিষ্কের টিউমারের জন্য চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিলেন অনেকদিন। ২০১৯ সালে নভেম্বরের শেষ দিকে তিনি শ্বাসকষ্ট ও শারীরিক দুর্বলতাজনিত সমস্যা নিয়ে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি হন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের পথিকৃৎ এই সদা হাস্যোজ্জ্বল মানুষটি ২০ ডিসেম্বর, ২০১৯ তারিখে মারা যান। বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। বনানী কবরস্থানে স্ত্রী আয়শা হাসান আবেদের পাশেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত। মৃত্যুকালে তিনি পুত্র শামেরান আবেদ, কন্যা তামারা আবেদ ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

  • Save

চিত্র : স্যার আবেদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন
উৎস : দ্যা ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট

স্যার আবেদ ছিলেন গ্রামবাংলার পালাবদলের স্বপ্নদ্রষ্টা। সমাজে জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠায়ও তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তিনি আজীবন ‘আমি’ নয়, বরং মনেপ্রাণে ‘আমরা’ শব্দে বিশ্বাস করে গেছেন। তিনি বাঙালি জাতির কাছে এক আলোকবর্তিকা।

Leave a comment

Share via
Copy link