পাভলোভের কুকুর এবং Classical Conditioning

1,442 Views

ইভান পাভলোভ। একজন রাশিয়ান শারীরবিজ্ঞানি। ১৮৯০ সালে তার করা এক বিখ্যাত সাইকোলজিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট আচরণ বিদ্যার দুনিয়াতে এক নতুন ডাইমেনশন এনে দেয়। পরীক্ষাটি ‘পাভলোভের পরীক্ষা’ বা ‘পাভলোভের কুকুর’ নামে খ্যাতি লাভ করে। সে সময়টায় পাভলোভ প্রাণীর পাচন প্রণালী নিয়ে অনেকগুলো গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। একদিন তিনি লক্ষ্য করলেন, যে ব্যক্তি তার কুকুরগুলোকে খাদ্য সরবরাহের জন্য নিয়োজিত, তার উপস্থিতিতেই কুকুরগুলোর লালা ঝরতে শুরু করে। এ দেখে পাভলোভ অবাক হন। তিনি ভাবলেন যে, লালা তো খাদ্য দেখে ঝরার কথা! খাদ্য সরবরাহকারী কে দেখেই লালা ঝরার মানে কি? তাহলে কি এক্ষেত্রে খাদ্য সরবরাহকারী কোনো ট্রিগার বা উদ্দীপক হিসেবে কাজ করছে? এ ভেবে তিনি একটা পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন।

  • Save

চিত্রঃ পাভলোভের পরীক্ষা
উৎসঃ MinuteVideoscom

কুকুরের মুখের সাথে নল লাগিয়ে দেয়া হল, যার মাধ্যমে উৎপন্ন লালা একটি স্বয়ংক্রিয় পরিমাপকের মধ্যে চলে যাবে। এরপর তিনি একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর কুকুরটিকে কয়েকবার খাওয়া দিলেন। প্রথমবার, শুধু খাওয়া দিলেন। এরপরের বার শুধু একটি বেল বাজালেন। তারপর কয়েকবার খাওয়াও দিলেন এবং একই সাথে বেলটিও বাজালেন। আর সব শেষে খাদ্য দেয়া ছাড়াই শুধু বেলটি বাজালেন এবং অবাক হয়ে দেখলেন যে, খাদ্যের অনুপস্থিতিতেও কুকুরের জিভ থেকে লালা ঝরছে!

  • Save

চিত্রঃ পাভলোভের পরীক্ষার ধাপসমূহ
উৎসঃ simplypsychology.org

এ থেকে তিনি সিদ্ধান্তে আসলেন যে, খাদ্য দেয়ার সময় যদি কোনো উদ্দীপক নিয়মিতভাবে উপস্থিত থাকে, তাহলে সেই উদ্দিপকটিকেও কুকুরটি খাদ্যের সাথে সম্পর্কিত করে নেয় এবং আপনা হতেই লালার উৎসারণ ঘটায়। পাভলোভ যখন তার এই রিসার্চটি প্রকাশ করেন, তখন সেখানে তিনি খাদ্যকে বলেন ‘Unconditioned উদ্দীপক’। কারণ খাদ্যের উপস্থিতিতে লালা ঝরানোর ব্যাপার কুকুরটা আচরনগত ভাবে শিখে নেয় নি। এটা একটা প্রাকৃতিক রেসপন্স। যার উপর কুকুরের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

অন্যদিকে, শুধু বেলটি যখন বাজছিল, তখন সেটি ছিল একটি ‘Neutral বা নিরপেক্ষ উদ্দীপক’। মানে এর সাথে লালা ঝরার কোনো সম্পর্কই নেই। আবার, যখন খাদ্য দিতে গিয়ে একই সময়ে  বারবার বেলটি বাজানো হচ্ছিল, তখন ‘Neutral বা নিরপেক্ষ উদ্দীপক’ থেকে বেলটি হয়ে উঠে ‘Conditioned উদ্দীপক’। অর্থাৎ পরেরবার খাওয়া দেয়া ছাড়াই শুধু বেল এর আওয়াজে কুকুরটি একইরকম প্রতিক্রিয়া দেখাতে (লালা ঝরাতে) শুরু করে। তার মানে কুকুরটির আচরণগত পরিবর্তন আসে।

আর এই যে এখানে বারবার আচরণগত পরিবর্তনের কথা বলে হচ্ছে, বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘Classical Conditioning’. ‘Conditioned উদ্দীপক’ কে ‘Unconditioned উদ্দীপক’ এর সাথে যথাযথভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি সম্পাদিত হয়ে থাকে।

তিনি তাঁর রিপোর্টে আরো ৪টি অনুসিদ্ধান্তের কথা লিখেন-

১। বেল বাজানো এবং খাদ্য প্রদান করার মধ্যবর্তী সময় যত কম হবে, তত তাড়াতাড়ি কুকুরটির মধ্যে নতুন আচরণ গড়ে উঠবে।

২। খাদ্যের উপস্থিতিতে যে পরিমাণ লালা উৎপন্ন হয়, শুধুমাত্র বেল এর আওয়াজে একই পরিমাণ লালা উৎপন্ন হয় না। তার মানে, Conditioned রেসপন্স এবং Unconditioned রেসপন্স একেবারে হুবুহু হয় না।

৩। যদি ‘Conditioned উদ্দীপক’ অনেকগুলো থাকে, তখন সাধারণত আচরণগত পরিবর্তন হয় না।

৪। এই আচরণগত পরিবর্তন একেবারে অমোচনীয় নয়। ‘Extinction Method’ এর মাধ্যমে এই পরিবর্তন আবার Reset করে দেয়া সম্ভব। যদি ‘Conditioned উদ্দীপক’ কে বারবার ‘Unconditioned উদ্দীপক’ এর অনুপস্থিতিতে উপস্থাপন করা হতে থাকে অর্থাৎ খাদ্য দেয়া ছাড়াই যদি কেবল বেল বাজানো হতে থাকে, তাহলে এক সময় কুকুরটি থেকে বেল এর আওয়াজ শুনেই লালা ঝরার অভ্যাস’ টি চিরতরে হারিয়ে যাবে।

এ সময় কুকুরটির মস্তিষ্কের ভেতর কিভাবে প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়?

যখন কুকুরটি খাদ্য দেখে, তখন চোখ এবং নাক থেকে পাওয়া সিগন্যাল মস্তিষ্ককে উদ্দীপ্ত করে লালা গ্রন্থিকে চালু করার জন্য, যা তার পরিপাকে সহায়তা করবে। কিন্তু যখন একই সময় বেল বাজানো হয়, তখন তার কানও সিগন্যাল পাঠাতে শুরু করে। তাতে একটি নতুন সিন্যাপটিক কানেকশন তৈরী হয় এবং সময়ের সাথে সাথে তা এতই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, শুধুমাত্র বেল বাজানোর আওয়াজ শুনেই কুকুরটির লালা গ্রন্থি চালু হয়ে যায়।

Classical Conditioning এর কিছু বাস্তব উদাহরণঃ

১। চিন্তা করে দেখুন তো! আশেপাশে যখনই কোনো পরিচিত রিং টোন কিংবা নোটিফিকেশন টোন শোনা যায় (তা যতই ম্রিয়মাণ হোক না কেন) তখন আপনি কি করেন? আমাদের হাত তখন ঠিকই আমাদের পকেট বা পার্সে চলে যায় মোবাইল ফোনটি চেক করার জন্য। এটি Classical Conditioning এর একটি চমৎকার উদাহরণ।

২। এখন যে উদাহরণটি দিব তাতে Classical Conditioning ব্যাপারটিকে সবচেয়ে সার্থকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং মোটামুটি আমরা সকলেই তার শিকার। সেলিব্রিটিদেরকে দিয়ে পণ্যের বিজ্ঞাপন তো আমরা অহরহ দেখি। কেন এমনটা করা হয় তা কি কখনো ভেবেছেন? সেলিব্রিটিদের (যেমনঃ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, মহেন্দ্র সিং ধোনি, শাহ্রুখ খান, এমা ওয়াটসন ইত্যাদি) কে দেখে মানুষের মধ্যে যে পজিটিভ ফিলিং জাগ্রত হয়, ঠিক তাদের দ্বারা Advertised কোনো পণ্যের প্রতিও একই রকম পজিটিভ ফিলিং কাজ করে। আর একে পুঁজি করেই চলছে বর্তমান বিশ্ববাণিজ্যের প্রসার।

৩। রেস্টুরেন্টে অনেক সময় কাচ্চি, বিরিয়ানি অথবা ওভেন থেকে সদ্য নামিয়ে আনা গরম গরম পিজ্জার সুঘ্রাণকে ব্যবহার করা হয়। যাতে আপনি খাওয়া অর্ডার করার আগেই আপনার মুখে লালা চলে আসে এবং ক্ষুধা বেড়ে যায়।

৪। আরেকটা প্রাত্যহিক জীবনের উদাহরণ দেয়া যাক। মাঝে মধ্যে এমন হয় যে আপনাকে ঠেকায় পড়ে কোনো একটি অপছন্দের খাওয়া গ্রহণ করা লাগছে। এখন ধরে নিই, অতীতে সেই খাদ্যটি গ্রহণের জন্য আপনার বমি হয়েছিল অথবা আপনার পেটে অসুখ হয়েছিল। তাহলে এটি খুবই সম্ভাব্য যে বর্তমানে সেই খাদ্য গ্রহণ কিংবা শুধুমাত্র সেই খাদ্যটির গন্ধই আপনার শরীর খারাপ করে দিতে পারে।

৫। পরীক্ষার হলের কাগজ, চক, ডাস্টার, বোর্ড, নীরবতা, ঘড়ির টিকটিক আওয়াজ ইত্যাদি আমাদের মধ্যে একটা নেগেটিভ ফিলিং তৈরি করে, নার্ভাসনেস তৈরি করে। আমরা যদি এমন পরিস্থিতিকে অন্য কোথাও রিক্রিয়েট করে, তার সাথে কোনো পজিটিভ ফিলিং আসে এমন কিছু সম্পর্কিত করে নিই, তাহলে খুব সহজেই আমরা আসল পরীক্ষার হলে নেতিবাচক মনোভাব অর্থাৎ নার্ভাসনেস, টেনশনকে উতরাতে পারব।

“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”-  গানটি শুনলে কেমন ঈদ ঈদ অনুভূতি আসে না? ট্যুরে/ পিকনিকে বারবার বাজানো কোনো গান শুনলে কেমন ট্যুর ট্যুর ভাব অনুভূত হয় না? ছোটবেলার কোনো টিভি প্রোগ্রামের টিউন/গান/ ছড়া শুনলে কেমন যেন সেই সময়ের দুরন্তপনা, সরলতা, নির্ভার জীবন- এই ব্যাপারগুলো অনুভূত হয় না?  

এ সবই হল Classical Conditioning!

Leave a comment

Share via
Copy link