মেট্রিক ও ইংলিশ এককের রেষারেষিতে নাসার অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল যেভাবে

1,179 Views

অনেক সময় আমরা কঠিন কোন কিছুর উপমা দিতে গিয়ে রকেট সায়েন্সের সাথে তুলনা করি। সেই জটিল রকেট সায়েন্সের সবচেয়ে বড় গবেষণা ও পরিচালনা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে নাসা। মহাকাশে নাসার রয়েছে একক আধিপত্য। মহাকাশ গবেষণায় পৃথিবীর অন্য যে কোন প্রতিষ্ঠান থেকে  নাসা যোজন যোজন এগিয়ে।

১৯১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিমানচালনাবিদ্যা, আকাশ পথে যুদ্ধ পরিচালনা সহ এ ধরনের কাজ গুলোতে উন্নয়ন ও গবেষণার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করে নাকা(NACA) নামের এক প্রতিষ্ঠান। যা ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত একই নামে পারিচালিত হয়। ১৯৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার নাকা ভেঙে দিয়ে তাকে নাসা(NASA) নামে নতুন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। মূলত মহাকাশ গবেষণা, রকেট সায়েন্স সহ যাবতীয় বিষয়ে গবেষণার পরিধি বৃদ্ধি করার জন্য এটি করা হয়। শুরু থেকেই নাসা বেসামরিক সংস্থা হিসেবে কাজ করে আসছে। 

মহাকাশ গবেষণার প্রথম যুগের চন্দ্র অভিযান থেকে হালের মঙ্গল অভিযান পর্যন্ত বড় বড় অভিযান পরিচালনা করে নাসা তার সক্ষমতা ও ব্যাপকতার প্রমাণ দিয়ে আসছে। বর্তমানে নাসায় কর্মরত আছেন প্রায় সাড়ে সতের হাজার কর্মকর্তা। ২০২০ সালে নাসার বাজেট প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার। যা পৃথিবীর অনেক দেশের বাৎসরিক বাজেট থেকে বেশি। 

এতক্ষণ তো নাসার ব্যাপকতা আর সফলতার কথা বললাম। এবার চলুন নাসার খুব সুক্ষ্ম এক ভুলের কথা বলি। সেবার সামান্য একক পরিবর্তনের ভুলে নাসা হারিয়েছিল ১২৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের রোবট স্যাটেলাইট। যা বানানো হয়েছিল মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণের জন্য। ১১ ডিসেম্বর, ১৯৯৮ সালে মঙ্গল গ্রহের জালবায়ু, বায়ুমণ্ডল ও ভূমি পর্যবেক্ষণ করার জন্য পৃথিবী থেকে ” মার্স ক্লাইমেট অরবিটার” নামের এক স্যাটেলাইট পাঠায় নাসা। যার দৈর্ঘ্য ২.১ মিটার, প্রস্থ ১.৬ মিটার এবং উচ্চতা ছিল ২ মিটারর। এটির ওজন ছিল ৬৩৮ কেজি বা ১৪০৭ পাউণ্ড।  এই স্যাটেলাইটের প্রধান উদ্দেশ্য গুলো ছিল: 

১) মঙ্গলে পানির উৎস অনুসন্ধান করা।

২) প্রতিদিনের আবহাওয়া ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা।

৩) বাতাস এবং অন্যান্য বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনা কিভাবে মঙ্গল পৃষ্ঠে পরিবর্তন নিয়ে আসে তা রেকর্ড করা।

৪) মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা। 

৫) বাতাসে জলীয় বাষ্প ও ধূলিকণার পরিমাণ নির্ণয়। 

৬) মঙ্গলের জালবায়ু পরিবর্তনের অতীত ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করা।

 পৃথিবী থেকে মঙ্গল অভিমুখে ২৫৬ দিনের যাত্রা শেষে ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ সালে মঙ্গলের কক্ষপথে প্রবেশের পর স্যাটেলাইটটি পরিচালন ইঞ্জিন থেকে নিজেকে পৃথক করে নেয়। কিন্তু হিসেবের ভুলে এটি তখন তার আবর্তন পথের সীমানা অতিক্রম করে মঙ্গলের ভূমির কাছকাছি চলে যায়। ফলে স্পেসক্রাফটি হয়তো মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের সংঘর্ষে নষ্ট হয়ে যায় অথবা মহাশূন্যে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। হিসেবের ভুল হয়েছিল লকহেড মার্টিন স্পেস এবং নাসার মধ্যে। লকহেড মার্টিন স্পেস হচ্ছে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। যারা সামরিক ও বেসামরিক স্যাটেলাইট, স্পেসক্রাফট, মিসাইল ইত্যাদি বানিয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো রাজ্যের ডেনভারে তাদের সদর দপ্তর অবস্থিত। নাসা সহ বিভিন্ন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা এবং সামরিক বাহিনী তাদের ক্রেতা। নাসা মার্স ক্লাইমেট অরবিটার স্যাটেলাইটটি তাদের থেকে ক্রয় করেছিল। মঙ্গলের কক্ষপথে এটিকে স্থাপনের কাজে লকহেড এবং নাসা যৌথভাবে কাজ করছিল। 

লকহেড এর ইঞ্জিনিয়াররা স্পেসক্রাফট পরিচালনার কাজে ব্যবহার করছিলেন ইংলিশ ইউনিট বা ইমপেরিয়াল ইউনিট ( ফুট, পাউণ্ড, সেকেণ্ড)। অন্যদিকে নাসা ব্যবহার করে মেট্রিক সিস্টেম ( মিটার, কেজি)। লকহেড এর ইঞ্জিনিয়াররা স্পেসক্রাফট থেকে প্রাপ্ত ডাটা নাসার কাছে পাঠাচ্ছিলেন ইমপেরিয়াল সিস্টেমেই। আর নাসার সফটওয়্যার ধরে নিয়েছিল সমস্ত ডাটা পাঠানো হচ্ছে মেট্রিক সিস্টেম ব্যবহার করে। ফলে ইমপেরিয়াল বা ইংলিশ সিস্টেমের ডাটা গুলো আর মেট্রিক সিস্টেমে রূপান্তর না করেই ব্যবহার করে যাচ্ছিল নাসা। এভাবে হিসেবের গড়মিল সৃষ্টি হয়। এই সামান্য ভুলের কারণে নির্ধারিত দিনে স্পেসক্রাফট টি তার কাঙ্খিত উচ্চতা থেকে ২৫ কিলোমিটার নিচে নেমে যায় এবং মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ফলশ্রুতিতে পৃথিবী থেকে স্পেসক্রাফট এর নিয়ন্ত্রণ হারান বিজ্ঞানীরা। ধূলিসাৎ হয় শত মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প।

নাসা ১৯৯০ সাল থেকে তাদের সমস্ত গণনার কাজে মেট্রিক সিস্টেম ব্যবহার করে আসছে। যার কারণে ইঞ্জিনিয়াররা ধরেই নিয়েছিল তাদের কাছে সব ডাটা মেট্রিক সিস্টেমেই আসবে। একক পরিবর্তনের ভুলে এমন দূর্ঘটনা এই ঘটনার পূর্বে ও পরে বিশ্বের অন্যান্য জায়গায়ও ঘটেছিল।

Let’s scrutinize past and present to see what’s waiting in the future.

Leave a comment

Share via
Copy link