একজন নিভৃতচারী অভিনেতা

1,153 Views
  • Save

চিত্র: ডেনিয়েল ডে লুইস
Source: IMDb

হলিউডের রঙ্গিন জগতের নায়কদের কথা ভাবলেই লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও, টম ক্রুজ, ব্র্যাড পিট কিংবা হালের ক্রিস হেমসওয়ার্থের কথা মনে পড়ে। অবশ্যই তারা তাঁদের অভিনয়, ব্যক্তিত্ব, ক্যারিশমা দিয়ে এই অবস্থান তৈরি করেছেন। কিন্তু যদি শুধু অভিনয় এর কথা বলা হয় এবং তা যদি হয় মেথড এক্টিং তাহলে কিছু মানুষ যেন আড়ালেই থেকে যান। অসম্ভব প্রতিভাবান সেইসব মানুষদের অগ্রভাগেই থাকবেন স্যার ডেনিয়েল ডে লুইস।

অভিনয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর  কৌশল হল মেথড এক্টিং। অভিনয়কালীন নিজের চরিত্রকে পুরোপুরি ধারণ করা এই ধারার অন্যতম অংশ। মারলন ব্র্যান্ডোকে যদি এই মেথড এক্টিং এর পুরোধা বলা হয় তবে মেথড এক্টিং কে পূর্ণতা দান করেছেন ডেনিয়েল ডে লুইস। মেথড এক্টিং এর উপর তার অসামান্য দখল তাকে নিয়ে গিয়েছে অন্য উচ্চতায়। যার ফলশ্রুতিতে, ইতিহাসের প্রথম ও একমাত্র অভিনেতা হিসেবে জিতেছেন “বেস্ট এক্টর ইন এ লিডিং রোল”-এ ৩ বার অস্কার। অনেক চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের মতে যা তাকে এনে দিয়েছে “শ্রেষ্ঠ জীবন্ত অভিনেতা”-র মুকুট।

  • Save

চিত্র: হলিউডের একমাত্র অভিনেতা হিসেবে জিতেছেন রেকর্ড ৩বার অস্কার
Source: www.nydailynews.com

কবি পিতা ও অভিনেত্রী মাতার কোল আলো করে এই কিংবদন্তি অভিনেতা জন্ম নেন ১৯৫৭ সালে ইংল্যান্ডের লন্ডনে। মাতামহ স্যার মাইকেল ব্যালকন ছিলেন একজন চলচ্চিত্র প্রযোজক এবং “ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট” এর চেয়ারম্যান। একজন শিল্পীর রক্ত যেন তার শরীরেই ছিল প্রথম থেকে।

তবে অবাক করা ব্যাপার হল, একটি চলচ্চিত্র পরিবারে জন্ম নিয়েও কিশোরকালে অভিনয়ের চেয়ে কাঠের তৈরি কারুশিল্পের প্রতি ডে লুইসের আগ্রহ বেশি ছিল। একজন কারুশিল্পী হিসেবেই তিনি জীবিকা নির্বাহের কথা ভাবছিলেন। কিন্তু মাত্র পনের বছর বয়সে তার বাবার মৃত্যু তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত অভিনয়কেই তিনি বেছে নেন। 

মঞ্চ থেকে উঠে আসা ডে লুইস “ন্যাশনাল ইয়ুথ থিয়েটার”-এ কৃতিত্বের সাথে অভিনয় করে যান। এরপর অভিনয়ের জন্য ভর্তি হয়ে যান ইংল্যান্ডের বিখ্যাত “ব্রিস্টল ওল্ড ভিক থিয়েটার স্কুল”-এ। সেখানেই ডে লুইসের শিক্ষক জন হারটচ শান্ত, নিরীহ ডে লুইসের মধ্যে যেন এক বিশেষ প্রতিভা দেখতে পান।

সেই বিশেষ প্রতিভা ফুটে উঠতে খুব বেশি সময় লাগেনি। মঞ্চে অভিনয়ের পাশাপাশি টেলিভিশন চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে যান। যদিও শিশু অভিনেতা হিসেবে ১৯৭১ সালেই Sunday Bloody Sunday-তে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে মূলধারার চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় Gandhi-তে একটি ছোট চরিত্রের মাধ্যমে। তবে তার ব্রেকথ্রুটা আসে ১৯৮৫ সালে নির্মিত My Beautiful Laundrette দিয়ে। অসাধারণ অভিনয় দিয়ে চলচ্চিত্র অনুরাগী, সমালোচকদের মন জয় করেছিলেন। আর চূড়ান্ত সাফল্য আসে ১৯৮৯ সালে তার অভিনীত My Left Foot দিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম অস্কার জয়ের মাধ্যমে।

এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৮৯ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত মাত্র ১৩টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এর মধ্যে ৯টিতেই ৩টি মেজর এওয়ার্ড(অস্কার,বাফটা,গোল্ডেন গ্লোব) গুলোর মধ্যে অন্তত একটিতে “বেস্ট এক্টর” বিভাগে জিতেছেন অথবা নমিনেশন পেয়েছেন। এই বিরল অর্জন খুব কম অভিনেতাই পেয়েছেন।

এতসব ব্যক্তিগত অর্জন, এওয়ার্ড, সমালোচকদের প্রশংসা থেকেও যে জিনিসটি তাকে অনন্য করে তুলবে তা হল অভিনয়ের প্রতি তার তীব্র একনিষ্ঠতা। তিনি যে চরিত্রে অভিনয় করতেন অভিনয়ের পুরোটা সময় তিনি যেন সেই জীবন্ত চরিত্রে পরিণত হতেন। সেইসময় “ডেনিয়েল ডে লুইস” নামে কোন সত্তার উপস্থিতি থাকত না।

তার অস্কারজয়ী ছবি My Left Foot এর কথাই ধরা যাক। সেখানে তিনি পক্ষঘাত রোগীর চরিত্রে অভিনয় করেন। একজন পক্ষঘাত রোগীর জীবনের অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য অভিনয়ের পুরোটা সময় তিনি হুইলচেয়ারে ছিলেন এবং ক্রু মেম্বারদের সাহায্যে হুইলচেয়ারেই খাবার গ্রহণ করেন। অথবা Gangs of New York এর কথা। এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। কারণ উনবিংশ শতাব্দীর কাহিনীর উপর তৈরি হওয়া এই চলচ্চিত্রের শুটিং সেটে প্রচুর ঠান্ডা পড়ার পরও নিজের চরিত্রে থাকার জন্য আধুনিক কোট পড়তে অস্বীকৃতি জানান।

  • Save

চিত্র: My Left Foot চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সময়
Source: https://greysonengelman.wordpress.com/symbols/

একটু চ্যালেঞ্জিং টাইপের চরিত্র আসলেই তার জন্য নিয়ে নিতেন অসম্ভব রকমের প্রস্তুতি। The boxer এর জন্য আঠারো মাস ধরে বক্সিং এর ট্রেনিং কিংবা The Last of the Mohicans এর জন্য ছয় মাস বন্য পরিবেশে থাকা একজন প্রকৃত শিল্পীর তার শিল্পের মধ্যে বেঁচে থাকার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

অস্কার মনোনয়নপ্রাপ্ত পরিচালক পল থমাস অ্যান্ডারসন তো বলেছেনই, “You don’t go to work with Daniel Day Lewis,you go to work with whoever his character is.”

  • Save

চিত্র: বিখ্যাত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আব্রহাম লিংকন এর চরিত্রে ডে লুইস
Source: indianexpress.com

হলিউডের গ্ল্যামারাস জীবন যেন তাকে কখনোই স্পর্শ করেনি। ক্যারিয়ারের পুরোটা সময়ই ছিলেন আলোচনার বাইরে। এজন্যই হয়তোবা অন্যান্য অভিনেতাদের মত খ্যাতির শিখরে যেতে পারেননি। কিন্তু এইসব খ্যাতি যে সেলেব্রিটিদের জীবনযাপনের মতোই মেকি, তা তিনি তার অনবদ্য অভিনয় দিয়েই প্রমাণ করেছেন।

বেছে বেছে কাজ করার কারণে ডে লুইসের খুব বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় হয়ে উঠেনি। যা নিয়ে ভক্তদের আক্ষেপ সবসময়ই থাকবে। ১৯৯৮ এর পর মাত্র ৬টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ২০১৭ সালের Phantom Thread –এ অভিনয়ের পর অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে স্ত্রী রেবেকা মিলার ও তাদের দুই সন্তানকে নিয়ে আছেন অবসর জীবনে। সেখানেও আবার ভক্তদের প্রত্যাশা অদূর ভবিষ্যতে হয়তোবা কোন চলচ্চিত্রে তাকে একজন “অবসরপ্রাপ্ত অভিনেতা”-র চরিত্রে দেখা যাবে।

আজকের এই নায়কদের যুগে এই কীর্তিমান অভিনেতার প্রতি থাকলো আমাদের শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা।

Leave a comment

Share via
Copy link