চিলেকোঠার সেপাই (আখতারুজ্জামান ইলিয়াস)

1,702 Views

সবার প্রথমে যে কথাটা বলা দরকার, তা হলোঃ অসম্ভব শক্তিশালী লেখা।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখায় হাতেখড়ি হলো আমার এই উপন্যাসের মাধ্যমে, এবং সত্যিকার অর্থেই মুগ্ধ হলাম। এরকম কিছু আমি এর আগে কখনো পড়ি নি, পড়বো বলেও মনে হচ্ছে না। তাই শেষ করেও বারবার মনে হচ্ছে, কি অসাধারণ মেধাবী এবং নিপুণ গদ্যশিল্পী হলেই এমনটা লেখা সম্ভব!!
উপন্যাস সম্পর্কে চিরাচরিত ধারণা সম্পূর্ণ বদলে দেয়ার মত উপন্যাস চিলেকোঠার সেপাই।

প্রতিটা চরিত্রকে লেখক সময় নিয়ে, চিন্তা করে তৈরি করেছেন, কঙ্কাল থেকে রক্তমাংস দিয়ে গড়ে তুলেছেন। গল্প যত এগিয়েছে, চরিত্রগুলোও তত সুগঠিত হয়েছে। সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার হলো, প্রতিটা চরিত্রের চিত্রায়ন ভীষণ নগ্নভাবে উঠে এসেছে। বামপন্থী চেতনার এক যুবকের চিন্তা-ভাবনা, ভাষা, চালচলন যেমনটা হওয়া উচিত; আনোয়ার ঠিক তাই। আবার ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ একটা সময়ে দরিদ্র, উদ্বাস্তু, প্রান্তিক চরিত্র হিসেবে খিজিরের পারিপার্শ্বিকতা, ভাষা, পটভূমিরও সুনিপুণ চিত্রায়ন রয়েছে। প্রচুর খিস্তি-খেউড় রয়েছে, Raw বর্ণনা আছে, কিন্তু অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়নি কখনোই। বরং মনে হয়েছে, এমনটাই হওয়ার কথা ছিল।

বাংলা উপন্যাসে, গল্পে আমরা বোধহয় নিজেদের কমফোর্ট জোনে থেকে অভ্যস্ত। তাই চিলেকোঠার সেপাই পড়তে গিয়ে হোঁচট খেয়েছি আমি। এক বসায় খুব বেশি একসাথে হজম করতে পারি নি। লেখনীর গভীরতায়, তীব্রতায় আমি সময় নিয়ে গলঃধকরণ করেছি পুরোটা। শেষের দিকে খিজিরের মৃত্যুকালীন বর্ণনা পড়ে হতবাক হয়ে গিয়েছি। স্বগতোক্তির মত, নিজের কথ্য ভাবে প্রথমদিকে শারীরিক কষ্টের চেয়ে মানসিক অস্থিরতা, পরবর্তিতে অগ্নিকুণ্ডের মত সহসাই দৈহিক যন্ত্রণার আবির্ভাব, জীবনের পরিসমাপ্তি। এই বর্ণনা লেখক কিভাবে দিলেন? কোথায় পেলেন?
ক্লাসিক সাহিত্যে সন্ধ্যার শুরু হয় পশ্চিম আকাশে, গোধূলীর সঙ্গমে। কিন্তু লেখক চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন, সবসময় এমনটা আদিখ্যেতা। সন্ধ্যা বস্তির পাশের নর্দমা থেকেও উঠে আসে।
স্পষ্ট ভাষায় সাম্প্রদায়িকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন, বলেছেন – 
নামাজ পড়ার সঙ্গে সত্যনিষ্ঠ হওয়ার সম্পর্ক কি?

গণুঅভ্যুত্থানের বিক্ষুব্ধ ঢাকা যেমন দৃশ্যপটে এসেছে, তেমনি শ্রেণীশত্রুদের কবলে শোষিত যমুনা-পাড়ের দরিদ্র, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর গল্পও বলেছেন, হুবহু তাদের স্তরে নেমে এসেছেন। বিপ্লব এবং সংঘাতের শহুরে ও গ্রাম্য – দুটি ভিন্ন ধারাকে এক করেছেন।
তবে চিলেকোঠার সেপাই ওসমান গনির মানসিক টানাপোড়েন থেকে শুরু হওয়া ভারসাম্যহীনতার পরিণতি দেখতে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। বিপ্লবী হাড্ডিসার খিজিরের চরিত্রটি ওসমানের সাথে যুক্ত হয়ে লাভ করেছে এক অনন্য মাত্রা। ঘুরেফিরে তাকেই আমার মনে হয়েছে এই উপন্যাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী চরিত্র।।
উপন্যাসজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য রূপক, প্রহেলিকাময় ইঙ্গিত। মানসিক বৈকল্যের ফলে ওসমানের কণ্ঠে ঢাকার পথে পথে বুড়িগঙ্গার স্রোতে ছড়িয়ে পড়া আগুনের কথার সাথে যেন মিশে আছে আরো অনেক কিছু।।

বাংলা সাহিত্যের অন্যরকমের একটা মাস্টারপিস চিলেকোঠার সেপাই। অবশ্য-পাঠ্য উপন্যাস।

Simple and ambitious. I am always wishing to pay the bills with words.

Leave a comment

Share via
Copy link