সাজেক: মেঘের দেশে একদিন

1,881 Views

সাজেক ভ্যালির নাম কর্ণফুলী নদী থেকে উদ্ভূত সাজেক নদী থেকে এসেছে। সাজেক নদী বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত হিসেবে কাজ করে। সাজেক মূলত একটি ইউনিয়ন যা পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরে অবস্থিত। এটি পার্বত্য জেলা রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত, এটি খাগড়াছড়ি শহর থেকে ৬৭ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এবং রাঙ্গামাটি শহর থেকে ৯৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত।

সাজেক ভ্যালি তার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত এবং এর চারপাশে পাহাড়, ঘন জঙ্গল এবং তৃণভূমি পাহাড় রয়েছে। অনেক ছোট ছোট নদী পর্বতমালার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে যার মধ্যে কচালং এবং মাচালং উল্লেখযোগ্য। সাজেক ভ্যালি যাওয়ার পথে মাইনি রেঞ্জ এবং মায়নী নদী পার হতে হয়। সাজেকের রাস্তায় উঁচুতে শৃঙ্গ এবং ঝর্ণা রয়েছে। সাজেক ভ্যালির নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য গোটা একটা দিনই যথেষ্ট।

১২ জন বন্ধু মিলে ঢাকা থেকে গিয়েছিলাম সাজেক ভ্যালিতে। ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে রাতে দিনে যেকোনো সময়েই খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে শ্যামলী পরিবহন অথবা হানিফ পরিবহনসহ অনেক বাস ছাড়ে। আমরা সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে রাত ১১.৩০ এর সময় শ্যামলী পরিবহনে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেই। রাত ১১ টার দিকে রওনা দিলে খাগড়াছড়ি পৌঁছাতে ভোর হয় এজন্যই আর কি ঐ সময়টাতে রওনা দেওয়া।
মাঝে যাত্রা বিরতির জন্য কুমিল্লায় মোটামুটি সব বাস ই দাঁড়ায়। তো আমরা খাগড়াছড়িতে পৌঁছালাম ভোর ৫ টার দিকে। পাহাড়ি এলাকায় শীত অনেক এজন্য শীতের কাপড় নেওয়া অনেক জরুরি।

অনেক ভোরে পৌঁছানোর কারণে আমাদেরকে টার্মিনালে ২-৩ ঘন্টা কাটাতে হয়েছিলো। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকে চাঁদের গাড়িতে যেতে হয় এবং সব গাড়িই খাগড়াছড়ি থেকে সকাল ৮ টার পরে ছাড়ে। আমরা ভোরে পৌঁছানোর পরেই সকাল ৭ টার দিকে সকালের নাস্তা করে চাঁদের গাড়ি ভাড়া করে সাজেকের উদ্দেশ্যে রওনা দেই।

পুরো সাজেক ঘোরার জন্যই আমরা চাঁদের গাড়ি ভাড়া করেছিলাম এবং শর্ত ছিলো সেটা খাগড়াছড়িরও কয়েকটা জায়গা একবারে ঘুরিয়ে দেখাবে। ১০-১২ জন যাওয়া যায় একেকটা চাঁদের গাড়িতে ভাড়া ৮-১০ হাজার টাকা। আমরা ১২ জনের জন্য বড় চাঁদের গাড়িই ভাড়া করেছিলাম ভাড়া নিয়েছিলো ১০ হাজার টাকা তবে দামাদামি করলে কিছুটা কমে।

চিত্র : আকাশ, মেঘ এবং পাহাড়ের মিলবন্ধন
Source : www.google.com

যাই হোক নাস্তা করে চাঁদের গাড়ি ভাড়া করে অবশেষে ৯টার দিকে বেরিয়ে পড়লাম সাজেকের উদ্দেশ্যে। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকের দূরত্ব ৬৭ কিলোমিটার। যাওয়ার পথে দুইবার চেকপোস্ট পড়বে, সেনাবাহিনীদের চেকপোস্ট হওয়ায় নাম ঠিকানা সবকিছুই জানাতে হবে। সাজেক ভ্রমণে অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা আইডি কার্ড সাথে নিয়ে আসা জরুরি। অবৈধ কোনো জিনিসই নিয়ে ভ্রমণ করা যাবে না।

আমরা ১২ জন হওয়াতে কয়েকজন ভিতরে এবং কয়েকজন চাঁদের গাড়ির ছাদে বসেছিলাম। আঁকা-বাঁকা, উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তায় ছাদে বসে যাওয়ার মজাই আলাদা তবে তার জন্য অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যাওয়ার পথে আকাশ ও মেঘের সাথে পাহাড়ের মিতালী আপনাকে আবেগ তাড়িত হতে বাধ্য করবে। শুভ্র মেঘে পাহাড় ঢেকে যাওয়ার দৃশ্য আপনাকে মুগ্ধ করবে। ক্যামেরাই এই দৃশ্যগুলো বন্দী করতে ভুলবেন না। যদিও ক্যামেরার চেয়েও খালিচোখে হাজার গুণ সুন্দর।

খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যেতে কমপক্ষে ২-৩ ঘন্টা বা তার বেশি সময় লাগে। পাহাড়ি রাস্তার কাজের জন্য এবং চেকপোস্টে দেরি হওয়ায় আমাদের সাজেক পৌঁছাতে প্রায় ৪ ঘন্টা মতো সময় লেগেছিলো। আমরা দুপুর ১ টার দিকে পৌঁছেছিলাম সাজেক। আগে থেকেই রিসোর্ট বুক করে রাখতে হবে রাত থাকার জন্য। বিভিন্ন রেটেই রিসোর্ট পাবেন। এগুলো আপনার ইচ্ছার উপর নির্ভর করবে। আমরা মোটামুটি ভালো রিসোর্টই বুক করেছিলাম। দুইটা ডাবল আর দুইটা সিংগেল রুম সবমিলিয়ে ভাড়া পড়েছিল ৮ হাজার টাকা।

রিসোর্টে ব্যাগ রেখে, গোসল করে দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য বের হলাম। রিসোর্টের আশেপাশেই খাবার হোটেল আছে। মোটামুটি সবধরনের খাবারই পাবেন, তবে রেট একটু বেশি৷ যাই হোক আমরা ২.৩০ টার দিকে দুপুরের খাবার খেয়ে রিসোর্টে ফিরে গেলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকাল বেলা চাঁদের গাড়িতে করে বের হলাম সাজেকের অন্যতম আকর্ষণ কংলাক পাহাড় দেখার জন্য।

চিত্র : রিসোর্ট থেকে পাহাড় ও মেঘের মিলবন্ধনের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ
Source : bangla.bdnews24.com

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কংলাক পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় ১৮০০ ফুট। কংলাক পাহাড়ের উপরে কংলাক পাড়া অবস্থিত।সাজেক ভ্যালি মূলত রুইলুই পাড়া এবং কংলাক পাড়ার সমন্বয়ে গঠিত। কংলাক পাহাড় থেকে লুসাই পাহাড় স্পষ্ট দেখা যায়। চারদিকে পাহাড়, সবুজ আর মেঘের অকৃত্রিম মিতালী চোখে পড়ে। সাজেক ভ্রমণরত পর্যটকদের কাছে এটি এখন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। রুইলুই পাড়া হতে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরত্বে এটি অবস্থিত। সাজেকের হ্যালিপ্যাড হতে ৩০-৪০ মিনিট ট্রেকিং করে কংলাক পাড়ায় যেতে হয়। পাহাড়ের উপর তৈরী আসনগিলোয় বসে অবশ্যই ছবি তুলবেন – সত্যিই আপনি পাহাড় ও মেঘের মাঝখানে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় আঠারোশো ফুট উপরে আছেন তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য।

দূর থেকে দেখে মনে হবে, কোনো চিত্রশিল্পী তার রংতুলিতে ফুটিয়ে তুলেছেন পাহাড়ের বুকে মেঘের খেলা। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি অপরূপভাবে ধরা পড়ে সেখানে। কংলাক পাহাড় থেকে সূর্যাস্ত দেখতে এতোটা সুন্দর, অপরূপ লাগে তা আপনি নিজে না দেখলে অনুভব করতে পারবেন না। সূর্যাস্ত দেখে, ছবি তুলে নেমে পড়লাম কংলাক পাহাড় থেকে। যদিও সাজেকের রুইলুই পাড়া থেকে আরও ২-৩ ঘন্টা ট্রেকিং করে দেখে আসতে পারেন কমলক ঝর্ণা। সময় না থাকার কারণে আর সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ার কারণে আমরা যায়নি সেখানে। তবে সূর্যাস্তের দৃশ্য বাদ রেখে ওখানে না যাওয়াটাই ভালো, যদি একদিন সময় বেশি নিয়ে আসেন তাহলে যেতে পারেন।

কংলাক পাহাড় থেকে এসে চলে আসলাম সাজেক হ্যালিপ্যাডে। সেখানে সন্ধ্যায় সবাই মিলে ফানুস উড়ালাম এবং রাত ৮-৯ টা পর্যন্ত সবাই মিলে আড্ডা দিলাম। অতঃপর রিসোর্টে ফিরে সারারাত বিবিকিউ পার্টি করলাম। সাজেক ভ্যালি যাওয়ার আরও একটি আর্কষণ হলো ভোর বেলা পাহাড় ও মেঘের মিলবন্ধন। এজন্য আপনাকে ভোর হওয়ার আগেই উঠে পড়তে হবে। সব বন্ধুরা মিলে যাওয়ার কারণে রাতে আমরা ঘুমিয়েছিলাম সর্বোচ্চ ২-৩ ঘন্টা।

চিত্র : কংলাক পাহাড়
Source : flickr.com

অপরূপ দৃশ্য দেখার জন্য রাত ৪ টার সময়ই ঘুম থেকে উঠে পড়লাম। রিসোর্টের বারান্দায় যেতেই দেখি বারান্দাটাই মেঘে ঢেকে গেছে। আস্তে আস্তে সূর্য উঠতে লাগলো এবং আমরা চলে গেলাম সাজেক হ্যালিপ্যাডে। সাজেক হ্যালিপ্যাড থেকে আরও সুন্দরভাবে দেখা যায় আকাশ, মেঘ এবং পাহাড়ের মিলবন্ধন। শুভ্র মেঘে পাহাড় ঢেকে যাওয়ার দৃশ্য এতোটা রোমাঞ্চিত করবে আপনাকে সেটা নিজে অনুভব না করলে বুঝবেন না। কোনো চিত্রশিল্পী হয়তো এগুলো রংতুলি দিয়ে ধারণ করেছে বারেবার এটাই মনে হবে আপনার। সৃষ্টিকর্তার অপরূপ এই সৌন্দর্য দেখে খুব ইচ্ছা করবে, হাতের মুঠোয় করে কিংবা পকেটে ভরে এক টুকরো মেঘ বন্দী করে নিয়ে আসতে। কিন্তু এই মেঘগুলো শুধু চোখে দেখা এবং অনুভূতিতে করেই রাখা যায়।

অপরূপ সৌন্দর্য দেখে চলে আসলাম রিসোর্টে এবং সকালের নাস্তা করেই বেরিয়ে পড়লাম খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। শহরে ফেরত যাওয়ার পথে ক্লান্তি নেমে এসেছিলো সবার মাঝে, সারারাত বেশি ঘুম হয়নি। পুরো রাস্তা জুড়েই আমাদের সাথী হয়েছিলো মেঘ। আবারও ২-৩ ঘন্টা জার্নি করে চলে আসলাম খাগড়াছড়ির রিসাং ঝর্ণা আর আলুটিলা গুহা দেখার জন্য। সাজেক থেকে ফিরেই আমাদের সফর শেষ হয়ে গেছিলো প্রায়। রাতে বাস থাকায় হাতে কিছুটা সময় ছিলো। সময়টা কাজে লাগিয়ে ছিলাম খাগড়াছড়ি শহরে শপিং করেই।

অতঃপর রাতে বাসে উঠে পড়লাম। দুইটা দিন শরীরের পর দিয়ে বেশ ধকল যাওয়ায় অনেক ক্লান্ত ছিলাম। পুরো রাস্তা ঘুমাতে ঘুমাতে চলে আসলাম ঢাকায়। অনেক তাড়াতাড়িই চলে আসছিলাম ঢাকায় যদিও দিনশেষে অনুভূতি ছিলো- দীর্ঘদিন পর স্বচ্ছ পরিবেশে নিঃশ্বাস নিয়ে মুক্তি পাওয়ার মতো। প্রতি বছরই কয়েকবার এমন ভ্রমণ প্রয়োজন তাহলে ভ্রমণবিহীন আপনি আপনার ভেতরের সত্ত্বাকে জাগ্রত করতে পারবেন এবং আপনার দৃষ্টি ও মেধাশক্তিকে প্রখর করতে পারবেন। তাছাড়াও আপনি শহুরে যান্ত্রিকতা দূরে ঠেলে দিয়ে কয়েকদিনের জন্য শারীরিক ও মানসিক অবসাদ থেকেও মুক্তি পেতে পারেন।

Leave a comment

Share via
Copy link