ধর্ষণ ও ভূষণ

1,189 Views

ধর্ষণ বর্তমান বিশ্বের নারীসমাজের কাছে এক আতঙ্কের নাম। ধর্ষণকে মহামারীর সাথে তুলনা করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয় কেননা মহামারীর যেমন শুরু আছে তেমন শেষও আছে, শেষ যদি নাও হয় ভ্যাকসিন বা ঔষধের মাধ্যমে একে প্রতিরোধ করা যায়; তবে ধর্ষণের কি আদৌ কোনো শেষ আছে? প্রতি ১০০০ টি ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির ঘটনার মধ্যে মাত্র ২৩০ টি ঘটনা প্রশাসনের কাছে রিপোর্ট করা হয় যার অর্থ প্রতি ৪ টি ঘটনার মাত্র ৩ টি ঘটনা প্রকাশ পায় (উৎস: Rainn)। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ১৪ টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা হতে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে করা একটি জরিপ অনুযায়ী, ২০১৪ হতে ২০১৯ এর ৩০ জুন পর্যন্ত ৬৮৫৮ জন নারী ও শিশুর সাথে ধর্ষণ সংক্রান্ত যেমন, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষণের চেষ্টা ইত্যাদি ঘটনা ঘটে যার মধ্যে ৮৫৩ জন নারী ও শিশুর সাথে ধর্ষণের প্রচেষ্টা করা হয় (উৎস: Dhaka Tribune)। এমনকি ২০১৯ সালের প্রথম ৪ মাসে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৩ জন নারী বা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে (উৎস: New Age)

অপরাধের ধরণ২০১৪২০১৫২০১৬২০১৭২০১৮২০১৯ (জান-জুন)
ধর্ষণ৬৬৬৮০৮৮৪০৯৬৯৬৯৭৫৯২
গণধর্ষণ১৭৪১৯৯১৬৬২২৪১৮২১১৩
ধর্ষণের পর হত্যা৯৯৮৫৪৪৫৮৬৩২৬
ধর্ষণের চেষ্টা১১৫১৪২১৬৫১৮০১২৮১২৩

Source: Bangladesh Mohila Parishad (BMP)

দিন দিন ধর্ষণ, যৌন হয়রানি কিংবা যৌন সহিংসতার মাত্রা বেড়েই চলেছে। তবে এক শ্রেণীর মানুষের দাবি এই ধর্ষণের পেছনে মূলত নারীর পোশাকই দায়ী। এই দাবি কি আদৌ যৌক্তিক? কিংবা কতটুকুই বা জোরালো যখন শিশু ধর্ষণের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েই চলেছে? গত ১২ ফেব্রুয়ারি, নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী হিরামনি গণধর্ষিত হয় এবং ধর্ষণ পর তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় (উৎস: প্রথম আলো)। উল্লেখ্য তার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। এরকম অহরহ ঘটনা হরহামেশাই পত্রিকা খুললে পাওয়া যায়। আর এ ধরণের যৌন সহিংসতা কিংবা যৌন লাঞ্ছনার অধিকাংশ ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়। 

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম কর্তৃক প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন ‘State of Child Rights in Bangladesh 2019’-এ উল্লেখ করা হয় যে, ২০১৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ৩১৩৬ টি শিশু ধর্ষণের মামলা হয় যার মধ্যে মাত্র ১৬৪ টি মামলার রায় হয় এবং শুধু ২০১৯ সালে ১০০৫ জন শিশু ধর্ষিত হয়। ২০১৯ সালে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩ জন (২.৭৫ জন) শিশু ধর্ষিত হয়। এদের মধ্যে ৪৭ জন শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়, ১০৮ জন শিশুকে গনধর্ষণ করা হয় এবং ১৩৩ জনের বয়স ১ থেকে ৬ বছরের মধ্যে; এমনকি এদের মধ্যে ৪৪ জন শিশু ছিল বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু। এই ঘটনা গুলোর মধ্যে মাত্র ২৭ টি মামলার রায় হয়। যৌন হয়রানির শিকার শিশুদের সংখ্যা ২০১৮ সালের চেয়ে ২০১৯ সালে ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং শিশু হত্যার হার ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। তবে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (BSAF) ১৫ টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় ১৩৮৩ জন শিশু ২০১৯ সালে ধর্ষণের শিকার হয় (উৎস: Dhaka Tribune ও প্রথম আলো)। 

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মতে আইনের প্রতি অনাস্থার কারণে যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের শিকার হওয়া অধিকাংশই মামলা করে না। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা অনুযায়ী, ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ৪০০০ জন নারী ও শিশু ধর্ষণ কিংবা গণধর্ষণের শিকার হয় যার মধ্যে ৮৬ শতাংশই শিশু এবং তাদের বয়স ১২ বছর কিংবা তার নিচে। ২০১৯ সালের প্রথম ৩ মাসে ১২৩ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানায়, ২০১৯ সালের প্রথম ৪ মাসে ৩৪৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয় (উৎস: The Observer)। বাংলাদেশের শিশু ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষণের প্রচেষ্টা ইত্যাদির ভয়ানক মাত্রা দেখার পরও কি কারও পোশাককে ধর্ষণের পেছনের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা উচিৎ হবে; যেখানে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষণের প্রচেষ্টা ইত্যাদির শিকার হওয়া শিশুদের অধিকাংশই ১২ বছর কিংবা তার নিচে? পুরো পৃথিবীতে গড়ে প্রতি ৯ জন মেয়ে শিশুর মধ্যে ১ জন এবং গড়ে প্রতি ৫৩ জন ছেলে শিশুর মধ্যে ১ জন যৌন হয়রানি কিংবা ধর্ষণের শিকার হয়। তবে ১৮ বছর বয়সের নিচে অর্থাৎ শিশুদের মধ্যে যৌন হয়রানি কিংবা ধর্ষণের শিকার হওয়া শিশুদের অধিকাংশই মেয়ে শিশু (উৎস: Rainn)। 

হংকং এর কথাই ধরা যাক। হংকং এ পোশাক-আশাক নিয়ে তেমন বিধি-নিষেধ নেই কিংবা হংকং এর অধিবাসীদের অধিকাংশই বোরকা বা হিজাবের মত পোশাক পরিধান করে না। কিন্ত হংকং এ প্রতি ১ লাখে মাত্র ১.৫ জন নারী বা শিশু যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের শিকার হয় (উৎস: Knoema ও Quartz India)। ভারতের মোট যৌন হয়রানি কিংবা ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীর ৪১ শতাংশ শাড়ি এবং ৪৮ শতাংশ বোরকা পরিহিত থাকে (উৎস: News18)

উপর্যুক্ত পরিসংখ্যানগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করলে উপলব্ধি করা যাবে যে, ধর্ষণের পেছনে পোশাক-আশাকের ভুমিকা অত্যন্ত নগন্য বরং নৈতিক অবক্ষয়, শিশুদের ধর্ষণ কিংবা যৌন হয়রানি সংক্রান্ত বিষয়ে অজ্ঞতা, অনিয়ন্ত্রিত যৌন লালসা ইত্যাদি দায়ী।

Leave a comment

Share via
Copy link