অপরসায়ন থেকেই আধুনিক রসায়ন?

2,425 Views

প্রাচীনকালে কিছু বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে পৃথিবীর সবকিছুই কেবল মাটি, পানি, বায়ু ও আগুনের সমন্বয়ে গঠিত, ভিন্নতা শুধু পরিমাণে। এমনই ধারণার অনুপ্রেরণায় তৎকালীন গবেষকগণের মধ্যে হিরিক পড়ে যায় উক্ত চারটি উপাদানের মিশ্রণে মূল্যবান ধাতব পদার্থ গঠনের। ঐ যুগে স্বর্ণ(Gold)  ছিল তাদের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান ধাতু। আর তাই মিশ্রণ থেকে স্বর্ণ তৈরীর প্রয়াস ছিল সর্বাধিক। পৃথিবীর উপাদানগুলোর নিজেদের মধ্যে ক্রিয়া-বিক্রিয়ার মাধ্যমে স্বর্ণ তৈরির প্রক্রিয়াই হল আলকেমি (Alchemy)। আর মূলত একজন আলকেমিস্ট হলেন এমন কেউ যিনি চেষ্টা করেন কোন কিছুকে স্বর্ণে রূপান্তর করতে।

আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে গবেষকদের এই স্বর্ণ তৈরির প্রক্রিয়াগুলোকে তাদের বোকামি বলে মনে হতে পারে, যার ফলশ্রুতিতে রসায়নের ঐ আদি চর্চার নাম হয়ে গেল অপরসায়নবিদ্যা, ইংরেজিতে যা হল আলকেমি (Alchemy)। তবে কালের বিবর্তনে আমরা জানতে পারলাম যে, সেই সকল আলকেমিস্ট বা অপরসায়নবিদগণ আসলে সম্পূর্ণ ব্যর্থ মোটেই ছিলেন না। সেই স্বর্ণ তৈরির যত কলাকৌশল আবিষ্কার করতে গিয়ে বের হয়ে এসেছিল রসায়নশাস্ত্রের সব গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারসমূহ যার মধ্যে আজকের দিনের তেল শোধানাগার, রাসায়নিক বিক্রিয়ার ক্রম, মেটালার্জিকাল ইন্জিনিয়ারিং, ক্ষার, এসিড এই বিষয়গুলো ছিল।

বর্তমানে যত শিল্পায়ন ও নগরায়নের বিস্তার ঘটছে তার পেছনে বিভিন্ন জ্বালানি তেল, খনিজ পদার্থ, অ্যালুমিনিয়াম, বিভিন্ন ধাতব -অধাতব পদার্থ তথা রাসায়নিক উপাদানসমূহ সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা রেখে এসেছে সভ্যতার শুরু থেকেই। এই রসায়নের চর্চা কিন্তু সবচেয়ে তুঙ্গে ছিল ৯ম -১৪ তম শতকের মাঝে, যে সময়কে বলা হয় ‘দ্য গোল্ডেন এইজ অব সায়েন্স’। সেই সময়ে ইসলামিক স্কলার, চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানী ও দার্শনিকগণ সবচেয়ে বেশি অবদান রাখেন। বিজ্ঞানের এমন কোন শাখা ছিলনা যেখানে তাঁরা তাঁদের পাণ্ডিত্য প্রদর্শন করেননাই। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভৌতবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, রসায়নবিদ্যা, ধাতববিদ্যা সবকিছুতেই তখন ইসলামিক স্কলারগণের বিচরণ ছিল।

পাতনযন্ত্র
  • Save

চিত্রঃ পাতনযন্ত্র
Source: 1001inventions.com

আজকের মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তেল উত্তোলন, রিফাইনিং ও প্রক্রিয়াকরণের যে বিশাল শিল্পবিপ্লব ঘটে চলেছে, তার পিছনে কিন্তু এই আলকেমির যথেষ্ট অবদান রয়েছে। অপরিশোধিত তেলগুলোতে অনেক রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত থাকে। এই বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থগুলোকে আলাদা করার জন্য ভগ্নাংশ পাতন প্রক্রিয়া (Fractional Distillation Process) ব্যবহার করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় অপরিশোধিত তেলকে একটি বাত্যাচুল্লির মধ্যে প্রবেশ করানো হয়। যেখানে বিভিন্ন তাপমাত্রার বিভিন্ন চেম্বার থাকে। এই চেম্বারগুলোতে তাপমাত্রার বিভিন্নতায় পৃথকীকরণ পদার্থগুলোকে কুলিং টাওয়ারে ঠান্ডা করে পর্যায়ক্রমে বিটুমিন, ডিজেল, কেরোসিন, ন্যাপথা, পেট্রোল সহ আরও অনেক উপাদান শেষে গ্যাসীয় অবস্থায় পরিণত হয়। অবাক করা বিষয় হল, আজকের এই অত্যাধুনিত ওয়েল রিফাইনিং প্রসেসের আইডিয়া আজ থেকে এক হাজারের ও বেশি বছর আগের স্বর্ণযুগের বিজ্ঞানীদের ব্যবহারকৃত পাতনযন্ত্র (Alembic) এর অনুরূপ।

আলকেমিস্ট বললে প্রথমেই দুইজনের নাম বলতে হয়, একজন হলেন জাবির ইবনে হাইয়্যান এবং অন্যজন হলেন জাকারিয়া আল-রাযি। ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে, ‘জিবারিশ’। এর অর্থ হলো ‘অর্থশূন্য’। এই শব্দটি এসেছে মূলত জাবির নাম থেকেই! আলকেমি নিয়ে জাবির ইবনে হাইয়্যানের অনেক কাজই আধুনিককালের তাত্ত্বিকগণের নিকট অর্থহীন মনে হয়েছে। আর তা থেকে জাবিরীয় কাজগুলো, অর্থাৎ ইংরেজিতে ‘জিবারিশ’ শব্দটির অর্থই হয়ে গেছে অর্থহীন।

  • Save

চিত্রঃ আবু মুসা জাবির ইবনে হাইয়্যান
Source: sciencephoto.com

যদিও এই দুইজন ইসলামিক আলকেমিস্ট সরাসরি স্বর্ণ তৈরি করতে সক্ষম হননি, কিন্তু রসায়নের খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক বিষয়গুলো যেমন পাতন (Distillation), পরিস্রাবণ (Filtration), অনুমাপন (Titration), কাচ তৈরী (Glass Making), বিস্ফোরক পদার্থ (Explosives), জারক পদার্থ (Corrosives), ফর্টিফাইড ওয়াইন ইত্যাদি আবিষ্কার করতে সক্ষম হন তাঁরা।

এই আলকেমি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে জার্মান আলকেমিস্ট হেনিং ব্র্যান্ড ফসফরাস আবিষ্কার করে ফেলেন। তবে কিভাবে ফসফরাস আবিষ্কার করেন তা বেশ চমকপ্রদ। তিনি মূলত দেখতে চেয়েছিলেন মানুষের মূত্র থেকে স্বর্ণ তৈরি করা যায় কিনা! যেই ভাবনা, সেই কাজ! তিনি ৬০ বাকেট মূত্র সংগ্রহ করেছিলেন এবং পাতন প্রক্রিয়ায় স্বর্ণ তৈরি করতে গিয়ে স্বর্ণ হয়তো তৈরি করতে পারেননি কিন্তু ফসফরাস নামক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মৌল আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন যা আমাদের শরীরের মধ্যেই বিদ্যমান।

বিজ্ঞানের স্বর্ণালী যুগে মুসলিমদের দৈনিক সালাতের পূর্বে পবিত্রতার প্রতি গুরুত্ব রেখে সাবান শিল্পের গোড়াপত্তন হয়। এসিড ও ক্ষারের মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করেছিলেন জাবির ইবনে হাইয়্যান। ক্ষার (Alkali) যা সাবান তৈরির মূল উপাদান তা এসেছে আরবী আল-খালি শব্দ থেকে। জাকারিয়া আল-রাযি নবম-দশম শতকে সাবানায়ন (Saponification) পদ্ধতিতে ক্ষারের মাধ্যমে সাবান তৈরির পদ্ধতি বর্ণনা করেন। স্যাপোনিফিকেশন একটি প্রক্রিয়া যা জলীয় ক্ষার উপস্থিতিতে তাপের ক্রিয়া দ্বারা চর্বি বা তেল বা লিপিডকে সাবান ও অ্যালকোহলে রূপান্তর করে। সাবানে ফ্যাটি অ্যাসিডের লবণ এবং ফ্যাটি অ্যাসিডগুলি মনোকার্বোঅক্সিলিক অ্যাসিডগুলির দীর্ঘ কার্বন চেইন থাকে যেমনঃ সোডিয়াম প্যালমেটেট।

আলকেমি শব্দটি আরবি শব্দ كيمياء বা kīmiyāʾথেকে উদ্ভূত হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত প্রাচীন মিশরীয় শব্দ “কেমি” থেকে এসেছে, যার অর্থ কালো। পশ্চিমা রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরে, আলকেমিক্যাল বিকাশের কেন্দ্রবিন্দু খেলাফত এবং ইসলামী সভ্যতার দিকে চলে যায়।

আসুন, কয়েকজন আলকেমিস্টের পরিচয় জেনে নিই সংক্ষেপেঃ

খালিদ ইবনে ইয়াজাদ (Khālid ibn Yazīd)

গ্রন্থগ্রাহক ইবনে আল-নাদমের মতে, প্রথম মুসলিম আলকেমিস্ট ছিলেন খালিদ ইবনে ইয়াজাদ, যিনি আলেকজান্দ্রিয়ার খ্রিস্টান মেরিয়ানোসের অধীনে আলকেমি অধ্যয়ন করেছিলেন বলে জানা যায়। আলকেমির উপর তাঁর লিখিত বই Kitāb al-kharazāt (The Book of Pearls), Kitāb al-ṣaḥīfa al-kabīr (The Big Book of the Roll), Kitāb al-ṣaḥīfa al-saghīr (The Small Book of the Roll), Kitāb Waṣīyatihi ilā bnihi fī-ṣ-ṣanʿa (The Book of his Testament to his Son about the Craft), and Firdaws al-ḥikma (The Paradise of Wisdom)। তবে কিছু কিছু বই নিয়ে ইতিহাসবিদগণের মধ্যে সংশয় আছে।

জাবির ইবনে হাইয়্যান (Jābir ibn Ḥayyān)

জাবির ইবনে হাইয়ান এর পূর্ণ নাম হল আবু আবদুল্লাহ জাবির ইবনে হাইয়ান। তিনি আবু মুসা জাবির ইবনে হাইয়ান নামেও পরিচিত। কেউ কেউ তাঁকে “আল হাররানী’ এবং ‘আস সুফী’ নামেও অভিহিত করেন।

তিনি খুব সম্ভবত ৭২১ অথবা ৭২২ সালে ইরানের পার্শ্ব শহরের তুস শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তরুণ জাবির আরব আল-ইমিয়ারির অধীনে আরবে পড়াশোনা করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি কুফায় বসবাস করেন এবং অবশেষে বাগদাদে হিরান আল-রাশাদের পক্ষে আদালতের আলকেমিস্ট হন। কিছু সূত্র মতে ৮১৫ সালে তিনি টুস শহরে মারা যান। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছেঃ The One Hundred and Twelve Books; The Seventy Books; The Ten Books of Rectifications; and The Books of the Balance।

আবু বকর ইবনে জাকারিয়া আল-রাযি (Abū Bakr Ibne al-Rāzī)

আবু বকর ইবনে জাকারিয়া আল-রাযি ৮৬৪ সালে ইরানের তেহরান প্রদেশের রেই শহরে জন্মগ্রহন করেন। তিনি মূলত একজন চিকিৎসক ছিলেন। আলকেমির উপর তাঁর কাজ Sirr al-asrār (Latin: Secretum secretorum; English: Secret of Secrets.)

মুহাম্মদ ইবনে উমাইল আল-তামিমী (Muhammed ibn Umail al-Tamimi)

মুহাম্মদ ইবনে উমাইল আল-তামিমী দশম শতাব্দীর প্রতীকী-রহস্যময় শাখার আলকেমিস্ট ছিলেন। তাঁর বেঁচে থাকা রচনাগুলির মধ্যে একটি হল Kitāb al-māʿ al-waraqī wa-l-arḍ al-najmiyya (The Book on Silvery Water and Starry Earth). এই রচনাটি তাঁর কবিতা Risālat al-shams ilā al-hilāl (The Epistle of the Sun to the Crescent Moon) এর একটি অংশ থেকে সারাংশকৃত এবং এতে প্রাচীন লেখকদের অসংখ্য উদ্ধৃতি রয়েছে।

আল তুঘরাই (Al-Tughrai)

আল তুঘরাই ছিলেন ১১-২২শতকের একজন পার্সিয়ান চিকিৎসক। theMasabih al-hikma wa-mafatih al-rahma (The Lanterns of Wisdom and the Keys of Mercy) এই বইটি ম্যাটেরিয়াল সায়েন্সের তাঁর অন্যতম একটি বই।

আল যিলদ্বাকি (Al-Jildaki)

আল যিলদ্বাকি ছিলেন একজন পার্সিয়ান আলকেমিস্ট যিনি তাঁর Kanz al-ikhtisas fi ma’rifat al-khawas  বইতে ব্যবহারিক রাসায়নিক পরীক্ষার উপর গুরুত্ব দেন এবং বহু রাসায়নিক তথ্য ও পরীক্ষা লিপিবদ্ধ করেন।

বর্তমানে অনেক বিজ্ঞানী রসায়ন এবং অপরসায়নের মধ্যে কোন পার্থক্য করতে চাননা। বিজ্ঞানের সেই সোনালী দিনে মুসলিম আলকেমিস্টদের এই অবদানগুলো বর্তমান রসায়নের গতিপথ অনেকটাই সুগম করে দিয়েছে।

Co-Author: Sadman Tamzid

Leave a comment

Share via
Copy link